Thinking Person

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা আমাদেরকে (মুমিন মুসলিমদের) চিন্তাশীল (সুরা আল কামার (৫৪) আয়াত ১৭ : “আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কী?”) হতে বলেছেন, যাতে আমরা (মানুষরা) সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য গভীর জ্ঞান ও গবেষণার মাধ্যমে অনুধাবন করতে পারি। পবিত্র কুরআন মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা জ্ঞানগর্ভ কথা। তিনি তার জ্ঞানগর্ভ কথাকে সহজ করে দিয়েছেন চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য। তাই সর্বপ্রথম আমাদেরকে জানতে হবে মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য। যেহেতু তিনি আমাদেরকে ভালো এবং মন্দ কাজ করার ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করছেন, তাই তিনি আমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান কে কাজে উত্তম (সুরা আল মুলক (৬৭) আয়াত ০২ : “যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়”)। মজার ব্যাপার হলো, দুনিয়ার এই সংক্ষিপ্ত জীবনের কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে পরকালের অনন্ত জীবনে মানুষের ঠিকানা হবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম (সুরা মুহাম্মদ (৪৭) আয়াত ১৫ : “পরহেযগারদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তার অবস্থা নিম্নরূপ তাতে আছে পানির নহর, নির্মল দুধের নহর, যারা স্বাদ অপরিবর্তনীয়, পানকারীদের জন্যে সুস্বাদু শরাবের নহর এবং পরিশোধিত মধুর নহর। তথায় তাদের জন্যে আছে রকমারি ফল-মূল ও তাদের পালনকর্তার ক্ষমা। পরহেযগাররা কি তাদের সমান, যারা জাহান্নামে অনন্তকাল থাকবে এবং যাদেরকে পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি, অতঃপর তা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেবে?”)। অতএব, মুমিনদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করতে হলে অবশ্যই তাদেরকে চিন্তাশীল হতে হবে, মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক পালন করতে হবে, বান্দার বা মানুষের হককে অতীব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে, এবং মানুষের প্রধান শত্রু জিন শয়তান ও মানুষ শয়তানের অন্যায় কাজের প্ররোচনাকে পরাজিত করতে হবে। পবিত্র কুরআনের আলোকে কীভাবে মুমিনেরা চিন্তাশীল হবে তা আলোকপাত করা হলো :

১. মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সৃষ্টির সেরা হলো : মানুষ, কারণ সে চিন্তা করতে পারে, ভালো ও খারাপ বুঝার ক্ষমতা রয়েছে তার, এবং সে তার উদ্ভাবনী ও পরিশ্রমী দক্ষতা দিয়ে কোনো কিছু তৈরি করতে পারে, আবার ধ্বংসও করতে পারে। মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার অন্যান্য সৃষ্টি যেমন : আকাশ, বাতাস, পাহাড়, সমুদ্র, জীবজন্তু সবই তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন, যারা সর্বদাই আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার প্রশংসায় মশগুল (সুরা হাজ্জ্ব (২২) আয়াত ১৮ : “তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু আছে নভোমণ্ডলে, যা কিছু আছে ভূমণ্ডলে, সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং অনেক মানুষ। আবার অনেকের উপর অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন, তাকে কেউ সম্মান দিতে পারে না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন”)। তাই মুমিনদেরকে তাদের বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে চিন্তা করতে হবে তার এই দুনিয়ায় আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। পবিত্র কুরআন হল সত্য ও মিথ্যার ফয়সালাকারী (সুরা বাকারা (০২) আয়াত ১৮৫ : “রমজান মাসই হলো : সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তা’আলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর”; সুরা আল ফোরকান (২৫) আয়াত ০১ : “পরম কল্যাণময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফয়সালার গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হয়”; সুরা বনী ইসরাঈল (১৭) আয়াত ৮১ : “বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল” ) আসমানি কিতাব, যা মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের প্রিয় নবি রসুল (সা:) উপর প্রায় ১৪৫০ বছর পূর্বে নাজিলকৃত। সুতরাং, আমরা (মুমিন মুসলিমরা) যেন গভীরভাবে পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করে সত্য বুঝার চেষ্টা করার মাধ্যমে এই দুনিয়া এবং পরকালে জীবনে সাফল্য লাভ করতে পারি।

২. জিন শয়তান হলো মানুষের সবচেয়ে বড়ো প্রকাশ্য শত্রু, যে কিনা মানুষের মস্তিষ্কে কু-পরামর্শ দিয়ে সর্বদাই মানুষকে দ্বিধায় ফেলে, অন্যায় কাজে প্ররোচিত করে। সেজন্য, মুমিনদেরকে সবসময় সচেতন থাকতে হবে সত্য, ন্যায়, এবং ভালো কাজের প্রতি। এজন্য, পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে মুমিনদেরকে উদ্দেশ করে সতর্ক করা হয়েছে। জিন শয়তান মুমিনদেরকে সাদাকা দিতে বাধা দেয়, যদিও সাদাকা অভাবী ও দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তাদের দুঃসময়ে স্বস্তি দেয় এবং সমাজকে সুন্দর ও স্বাবলম্বী করে তুলে  (সুরা মুনাফিকুন (৬৩) আয়াত ৯, ১০ : “মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম”)। আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার স্মরণে নামাজ হলো মুমিনদের জন্য অন্যতম ইবাদত। তাই, নামাজের আজান বা নামাজের সময় শুরু হলেই আমরা নামাজ আদায়ে গুরুত্ব দেবো, যাতে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি। একইসাথে, নামাজ শেষে আমরা সত্য, ন্যায়, এবং ভালো কাজের প্রতি মনোনিবেশ করবো যাতে আমরা সবার জন্য সুন্দর ও পাপমুক্ত সমাজ গঠন করতে পারি, যেখানে সমাজের সবাই যেন ভালো থাকে, শান্তিতে থাকে। এক্ষেত্রে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক পালন করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই আমরা তা অর্জন করতে পারবো (সুরা আল জুমুআহ (৬২) আয়াত ১০ : “মুমিনগণ, জুম্মার দিনে যখন নামাযের আযান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে ত্বরা কর এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বুঝ। অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও”)। কঠোর পরিশ্রমের ফলে মুমিনদের অনেকেই অসুস্থ হবে, আর্থিক ক্ষতি হবে, এমনকি নিহত হতে পারে, তবুও ধৈর্যের সাথে মুমিনদেরকে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার আদেশ পালন করতে হবে (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ১৫৩, ১৫৪, ১৫৫, ১৫৬, ১৫৭ : “হে মুমিন গণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝ না। এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো। তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েত প্রাপ্ত”)। মুমিনেরা প্রায়ই বলে, আমি এটা করব, সেটা করব ইসলামের জন্য, কিন্তু পরে দেখা যায়, কাজটি করা তো দূরের কথা, তিনি ন্যূনতম চেষ্টাও করেননি, যা মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার কাছে খুবই নিন্দনীয় কাজ, তাই আমরা প্রকৃত মুমিনেরা যেন তা না করি। অবশ্যই আমরা জান-প্রাণ দিয়ে ইসলামের কাজ করব মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে (সুরা আছ-ছফ (৬১) আয়াত ২, ৩, ৪ : “মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা কেন বল? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক। আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সীসাগালানো প্রাচীর”)। তাহলেই মুমিনেরা তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফলস্বরূপ দুনিয়ার জীবনে পাবে হৃদয়ে স্বস্তি এবং আখেরাতের জীবনে পাবে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি, এবং আত্মার চরম সুখের জান্নাত (সুরা আছ-ছফ (৬১) আয়াত ১০, ১১, ১২ : “মুমিনগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেবো, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনপণ করে জেহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম; যদি তোমরা বোঝ। তিনি তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন এবং এমন জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং বসবাসের জান্নাতে উত্তম বাসগৃহে। এটা মহাসাফল্য”)।  

৩. মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করার জন্য কে কাজে উত্তম। তাই যে-সব মুমিনেরা এই দুনিয়ায় উত্তম কাজ করবে, তারাই পরকাল জীবনে হবে সৌভাগ্যবান। সেজন্য, মুমিনদেরকে তাদের বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আল্লাহর হক, মানুষের হক, এবং শয়তানের ধোঁকা বুঝে ন্যায়ের পথে থেকে ভালো কাজ করতে হবে। মুমিনদেরকে দুনিয়ার লোভ-লালসা, হিংসা, অহংকার ভুলে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক আদায়ের পাশাপাশি তার এই পৃথিবীতে কীভাবে আগমন হয়েছে তা চিন্তা করতে হবে, যাতে সে নম্র, ভদ্র, ও বিনয়ী হয়ে আরশের জাহানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে (সুরা সেজদাহ (৬১) আয়াত ৬, ৭, ৮, ৯ : “তিনিই দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী, পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু, যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে। অতঃপর তিনি তাকে সুষম করেন, তাতে রূহ সঞ্চার করেন এবং তোমাদেরকে দেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তঃকরণ। তোমরা সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর”)। মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা কাউকে কম আবার কাউকে বেশী রিজিক দেন; তিনি রিজিকের হ্রাস ও বৃদ্ধি করেন এজন্যে যে, সমাজে ভারসাম্য বজায় থাকে, অন্যথায় সমাজে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো, যেমন, কোন লোকেরা ফসল ফলাবে অথবা প্রয়োজনীয় শিল্প পণ্য উৎপাদন করবে, যদি মাত্র ধনী ব্যক্তিরা সমাজের বাসিন্দা হতো। তবে এটা কখনই কাম্য নয় যে রিজিক কম পাওয়া লোকেরা পুষ্টিহীনতা, চিকিৎসাবঞ্চিত, ও অভাব অনটনের মধ্যে দিন অতিবাহিত করবে। মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা এর সমাধানও পবিত্র কুরআনে দিয়ে দিয়েছেন, তা হলো : রিজিক বেশী পাওয়া ব্যক্তিরা অবশ্যই ফরজ জাকাত, সাদাকা, ও কর্জে হাসানের মাধ্যমে রিজিক কম পাওয়া লোকদের আর্থিক সহযোগিতা করবে, অন্যথায় তারা পাপী হবে এবং হাশরের ময়দানে জবাবদিহিতা করতে হবে (সুরা আশ-শুরা (৪২) আয়াত ২৭ : “যদি আল্লাহ তাঁর সব বান্দাকে প্রচুর রিজিক দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা সে পরিমাণ নাজিল করেন। নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের খবর রাখেন ও সবকিছু দেখেন”; সুরা  আল-যুমার (৩৯) আয়াত ৫২ : “তারা কি জানেনি যে, আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা রিজিক বৃদ্ধি করেন এবং পরিমিত দেন। নিশ্চয় এতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে”)। এজন্য মুমিনদেরকে বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে ন্যায়বিচার করতে হবে, যদিও প্রায়শ দেখা যায়, মুমিনরা যখন অভাবী থাকে তখন তারা পরহেজগারি হয়ে যান, আর যখনই মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা পক্ষ থেকে রিজিক বৃদ্ধি পায় তখন এমন ভাব ধরেন যেন কখনই অভাবী ছিলেন না। এর পরিণতিতে সমাজ কখনই ন্যায়বিচার ও স্বাবলম্বিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনা (সুরা আল-যুমার (৩৯) আয়াত ৪৯ : “মানুষকে যখন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে আমাকে ডাকতে শুরু করে, এরপর আমি যখন তাকে আমার পক্ষ থেকে নেয়ামত দান করি, তখন সে বলে, এটা তো আমি পূর্বের জানা মতেই প্রাপ্ত হয়েছি। অথচ এটা এক পরীক্ষা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বোঝে না”)।

৪. মহাজ্ঞানী, চিরঞ্জীব, করুণাময়, প্রজ্ঞাময়, দয়ালু, রিজিকদাতা, ও পরাক্রমশালী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা আমাদের রব, যিনি এই মহাবিশ্বের মালিক (সুরা আল মুমিন (৪০) আয়াত ৬৪, ৬৫ : “আল্লাহ, পৃথিবীকে করেছেন তোমাদের জন্যে বাসস্থান, আকাশকে করেছেন ছাদ এবং তিনি তোমাদেরকে আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর তোমাদের আকৃতি সুন্দর করেছেন এবং তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন পরিচ্ছন্ন রিজিক। তিনি আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা। বিশ্বজগতের পালনকর্তা, আল্লাহ বরকতময়। তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। অতএব, তাঁকে ডাক তাঁর খাঁটি এবাদতের মাধ্যমে। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর”)। তিনি (আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা) আমাদেরকে যে বিবেক ও বোধশক্তি দিয়েছেন তা দিয়ে অতি সহজেই বুঝতে পারি, তিনিই একমাত্র পবিত্র সত্তা যাকে আমরা (মুমিনেরা) বিশ্বাস করি, ভালোবাসি, তার ইবাদত করি, তার প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি যা কখনোই শেষ হবার নয়, এবং তার দেওয়া আদেশ মেনে সমাজে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় নিযুক্ত হই। মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোটি কোটি সৃষ্টি, যা মানুষের গণনায় অসীম, সেই সঙ্গে প্রতিটি সৃষ্টির চালচলন, ব্যাখ্যা, বৈশিষ্ট্য ও ভিন্নতা, সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে দেওয়া সৃজনশীলতা ও অবকাশ, মানুষের ন্যায়ের পথে অবিচল সংগ্রাম, চিরশত্রু শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মানুষের অন্যায় পথে লিপ্ত হওয়া, এবং মানুষের এই দুনিয়ায় টিকে থাকার জন্য কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা উদ্ভাবিত বস্তু তৈরি করতে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সাহায্য, যা এককথায় বিস্ময়কর এবং তাই আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার গুণগান করে কখনই আমরা (মুমিনেরা) শেষ করতে পারবো না (সুরা লোকমান  (৩১) আয়াত ২৭ : “পৃথিবীতে যত বৃক্ষ আছে, সবই যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথেও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও তাঁর বাক্যাবলি লিখে শেষ করা যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”; সুরা কাহফ (১৮) আয়াত ১০৯ : “বলুন, আমার পালনকর্তার কথা, লেখার জন্যে যদি সমুদ্রের পানি কালি হয়, তবে আমার পালনকর্তার কথা, শেষ হওয়ার আগেই সে সমুদ্র নিঃশেষিত হয়ে যাবে। সাহায্যার্থে অনুরূপ আরেকটি সমুদ্র এনে দিলেও”)। সুতরাং, আমরা (মুমিনেরা) গভীর চিন্তা করে, বুঝে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার প্রশংসা ও ইবাদত করব, যা তিনি আমাদেরকে পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে শিখিয়েছেন (সুরা আলাক (৯৬) আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫ : “পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না”)।

৫. মুমিনদেরকে পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোকে (মহাজ্ঞানী, চিরঞ্জীব, প্রজ্ঞাময়, ও পরাক্রমশালী মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা কথা) গভীরভাবে চিন্তা করে এর মর্মবাণী উপলব্ধি করে কাজ করতে হবে। দয়ালু মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা সবসময় প্রতিটি মানুষকে সাহায্য করেন, যারা মনে প্রাণে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক প্রতিষ্ঠায় পরিশ্রম করে (সুরা মুহাম্মদ (৪৭) আয়াত ৭ : “হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ় প্রতিষ্ঠ করবেন”)। যদিও তিনি মানুষকে অবকাশ দিয়েছেন তার ইচ্ছামাফিক কাজ করার, তাই মানুষ ন্যায় ও অন্যায় উভয় কাজই করতে পারে। যে-সব মানুষেরা ন্যায়ের পথকেই বেছে নিয়েছে, তারাই মুমিনের অন্তর্ভুক্ত? তবুও মুমিনদের মধ্যে তারাই সেরা এবং সফল যারা শুধু ন্যায়ের পথকেই বেছে নিয়েছে, তানয়, তারা ন্যায়ের পথকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। প্রতিটি মানুষ (অতীতে এসেছিল, বর্তমান আছে, এবং ভবিষ্যৎ আসবে) যখন আত্মার জগতে ছিল, তখন তারা আল্লাহ সুবহানাতাআলাকে তাদের রব হিসেবে মেনে নিয়েছিল। মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলার আদেশে এই আত্মাগুলো পরবর্তীতে দুনিয়াতে মানুষ হিসেবে পরীক্ষা দেবার জন্য বিভিন্ন মুসলিম বা অমুসলিম, ধনী অথবা দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিল, করছে এবং করবে (সূরা আল আরাফের (০৭) আয়াত ১৭২ : “স্মরণ কর, তোমার প্রতিপালক আদমসন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তার বংশধরকে বাহির করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই ?' তারা বলে, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই আমরা সাক্ষী রইলাম। এটা এইজন্য যে, তোমরা যেন কেয়ামতের দিন না বল, ‘আমরা তো এ বিষয়ে গাফিল ছিলাম”)। যদিও এই মানব সৃষ্টির মূল লক্ষ্য একটাই, আর তা হলো কোন আত্মা মানুষ হিসাবে কর্মে ভালো : শরীয়াহ বিধি (পবিত্র কুরআন ও রসুলের হাদিস) মেনে চলার মাধ্যমেই মানুষের আত্মা পবিত্র এবং ভালো হয়। তাই আমরা যে পরিবারেই জন্মগ্রহণ করিনা কেন, আখেরাতের জীবনে সাফল্য পেতে হলে আল্লাহ সুবহানাতাআলার মনোনীত ধর্ম ইসলামকে দ্বীন হিসেবে আকরিয়ে ধরতে হবে। আর আমরা যারা মুসলিম ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি, তাদের দায়িত্ব অনেক বেশী : দ্বীনের সৌন্দর্যের গবেষণায়, প্রচারণায়, এবং প্রতিষ্ঠায় (সূরা আল ইমরান (০৩) আয়াত ১৯: “নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ, যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি কুফরি করে তাদের জানা উচিত যে, নিশ্চিতরূপে আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত”; সূরা আল ইমরান (০৩) আয়াত ৮৫ : “যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতি গ্রস্ত”)। মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলার মানুষকে দেয়া অবকাশ এবং তার অসীম দয়ায় আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানুষ যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেছে। তথাপি মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবহানাতাআলা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানের যে সিমাবদ্ধতা রয়েছে তা জানিয়ে দিয়েছেন যাতে আমরা মুমিনেরা উপলব্ধি করতে পারি।  চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতিতে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, তবে মানুষ মরণশীল এটাই সত্য। যদিও জিন শয়তান ও মানুষ শয়তান সর্বদা মুমিনের সত্য চিন্তায় বাধা দেয় ও ধোঁকায় ফেলে এই বলে যে, মানুষ চিরন্তন জীবন লাভ করবে বিজ্ঞানের বদৌলতে (সুরা বনী ইসরাঈল (১৭) আয়াত ৮৫ : “তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন রুহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে”)।

৬. মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলার আদেশে বাবা ও মায়ের মাধ্যমে একটি শিশুর এই পৃথিবীতে আগমন ঘটে। বাবা ও মা অতি যত্নে পরিবারটিতে আসা প্রতিটি শিশুকে বড়ো করে তোলেন। প্রজ্ঞাময় ও রিজিকদাতা আল্লাহ সুবহানাতাআলা তার নেয়ামত হিসাবে কোন পরিবারে শুধু ছেলে অথবা মেয়ে সন্তান দিয়ে থাকেন, আবার কোন পরিবারে ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তানই দিয়ে থাকেন (সূরা আশ শুরা (৪২) আয়াত ৪৯ : “নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব আল্লাহ তা’আলারই। তিনি যা ইচ্ছা, সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা-সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন”)। ছেলে বা মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর, উভয়েই বিয়ের মাধ্যমে নয়া পরিবার গঠন করে আরেক নতুন প্রজন্মের এই ধরণিতে আসার দ্বার উন্মোচিত করেন। বিয়ের পর ছেলেরা সাধারণত বৃদ্ধ বাবা মায়ের সাথে থেকে যায় এবং তাদের সম্পত্তি দেখাশোনার পাশাপাশি পরিবারের আয়ের জন্য কাজও করেন, অন্যদিকে মেয়েরা অন্য বাড়ির বধূ হয়ে স্বামীর সংসার শুরু করেন। যদিও মেয়েরা তাদের প্রাপ্ত উত্তরাধিকার সম্পদ বৃদ্ধ বাবা-মা এবং ভাইদের জিম্মায় রেখে যান। বাবা ও মা পরলোকগত হলেই মেয়েরা তাদের উত্তরাধিকার সম্পদের হকদার হন। কিন্তু বাস্তবে মেয়েরা উত্তরাধিকার সম্পদ সঠিকভাবে পেতে যথেষ্ট ভোগান্তিতে পড়েন। তাই, উত্তরাধিকার সম্পদের নিশ্চিত ও সঠিকভাবে স্থানান্তরের জন্য বাবা ও মায়ের উচিত হবে, তাদের মৃত্যুর আগেই সব সন্তানদের সাথে বসে প্রজ্ঞাময় আল্লাহ সুবহানাতাআলার উত্তরাধিকার সম্পত্তির আদেশ অনুযায়ী বণ্টন করা (সূরা আন নিসা (০৪) আয়াত ১১ : “আল্লাহ তোমাদের সন্তান সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছেন : এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান; কিন্তু কেবল কন্যা দুই-এর অধিক থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ, আর মাত্র এক কন্যা থাকলে তার জন্য অর্ধাংশ। তার সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ, সে নিঃসন্তান হলে এবং পিতা-মাতাই উত্তরাধিকারী হলে তার মাতার জন্য এক-তৃতীয়াংশ, তার ভাই-বোন থাকলে মাতা জন্য এক-ষষ্ঠাংশ, এ সবই সে যা অসিয়ত করে তা দেওয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারে কে তোমাদের নিকটতর, তা তোমরা অবগত নও। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর বিধান; আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”)। এটা উদ্‌বেগজনক যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাবা ও মায়েরা সম্পদের বণ্টন করে যান না, ফলে ছেলে সন্তানেরা পেশিশক্তি ও কূটচালের মাধ্যমে বোনদের সম্পদ আত্মসাৎ করে। মেয়ে সন্তানদের উত্তরাধিকার সম্পত্তিতের বঞ্চনায় বাবা ও মায়েরা যেমনি হাশরের ময়দানে জিজ্ঞাসিত হবেন, তেমনি ছেলে সন্তানেরা কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হবেন। আমরা মুমিনেরা যেন এ ব্যাপারে সতর্ক হই।

৭. পরাক্রমশালী আল্লাহ সুবহানাতাআলা মুমিনদেরকে সুন্দর, পরিপাটি এবং পরিষ্কার পোষাক পরে নামাজ আদায় করতে বলেছেন, একইসাথে বলেছেন খাওয়া এবং পানীয় খেয়ে যেন আমরা নামাজ পড়ি (সূরা আরাফ (০৭) আয়াত ৩১ : “হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না”)। এতে মুমিনদের মন ও শরীর উৎফুল্ল থাকে মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলার দরবারে নামাজ আদায় করার। তবে, মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবহানাতাআলা তার জমিনে মুমিনদেরকে নামাজ প্রতিষ্ঠা করতে বলেছেন (সূরা ত্বোয়াহা (২০) আয়াত ১৪ : “আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে নামাজ কায়েম কর”)। এর মানে আমরা মুমিনেরা কি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছি? আজ মুসলিম বিশ্বে অভাবী ও দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে যারা তিন বেলা পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেনা। আমরা কি এই হতভাগা অভাবীদের জন্য নামাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? সুন্দর, পরিপাটি এবং পরিষ্কার পোষাক পরে, পুষ্টিকর খাবার খেয়ে, উৎফুল্ল মন ও শরীর নিয়ে অভাবীদেরও নামাজ পরার অধিকার রয়েছে। রিজিকদাতা আল্লাহ সুবহানাতাআলা পবিত্র কুরআনে বাধ্যতামূলক জাকাতের মাধ্যমে আট ধরনের অর্থনৈতিকভাবে শোচনীয় মুমিনের কথা বলেছেন, তারা হলো : দরিদ্র (ভিক্ষা করে জীবন চালায়), অভাবী (কাজ করে খায় তবে পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেনা), জাকাত আদায়কারী (বেকার শিক্ষিত ব্যক্তিকে কাজের সুযোগ করে দেওয়া), ইসলাম গ্রহণকারী (নতুন মুসলিম গ্রহণকারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা), দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রত্যাশী (অপহৃত ব্যক্তির মুক্তির জন্য মুক্তিপণের ব্যবস্থা করা), বিপুল ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি (ঋণে জর্জরিত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা), ধর্মীয় কারণে সংগ্রামী (ইসলাম প্রচারে অর্থনৈতিক সাহায্য করা) এবং আটকে পড়া ভ্রমণকারী (মুসাফিরের থাকা-খাওয়া সহ ভ্রমণের খরচ মেটানো) (সূরা আত তাওবাহ (০৯) আয়াত ৬০ : “জাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে; এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”)। তাই, মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি সমাজে অভিন্ন জাকাত ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা মুমিনেরা (যাদের জাকাত ফরজ) হতভাগা অভাবীদের জন্য সুন্দর পোষাক ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি, অন্যথায় আমাদেরকে আখেরাতে কঠোর শাস্তির (জাহান্নামের আগুন) মুখোমুখি হতে হবে, যা বিবেকবান মুমিনদের জন্য কখনই কাম্য নয় (সূরা আল ইমরান (০৩) আয়াত ১৮০ : “আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন, তাতে যারা কৃপণতা করে, এই কার্পণ্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যাতে তারা কার্পণ্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে কেয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে পরানো হবে। আর আল্লাহ হচ্ছেন আসমান ও যমীনের পরম স্বত্বাধিকারী। আর যা কিছু তোমরা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে জানেন”; সূরা আত তাওবাহ (০৯) আয়াত ৩৪, ৩৫ : “হে ইমানদারগণ! পণ্ডিত ও সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে চলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখছে। আর যারা স্বর্ণ ও রুপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আজাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার”)।

৮. বর্তমান বিশ্ব যেন ভোগ পণ্যের (দামি গাড়ি-বাড়ি-ফ্ল্যাট, বিলাসবহুল হোটেল-রেস্তোরাঁয় থাকা-খাওয়া, ব্যয়বহুল ভ্রমণ ও ছুটি কাটানো, সীমাহীন আনন্দ-উল্লাস-ফুর্তিতে মেতে থাকা ইত্যাদি) সমারোহে পর্যবসিত হয়েছে। ফলে, মানুষ হালাল উপার্জনের সুখ অনুভূতিকে তোয়াক্কা না করে যে-কোনো উপায়ে তার ভোগ পণ্য চাই, এমন নীতিকে সে সুখ অনুভূতি বলে মনে করছে। আজ হারাম উপার্জনের (সুদ, ঘুস, চুরি, ডাকাতি, উত্তরাধিকার সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি) মাধ্যমে হলেও ভোগ পণ্যের সুখকে সীমাহীন ও অনন্ত বলে মনে করে মানুষ তার চাওয়াকে পাওয়াতে পরিণত করতে যে-কোনো অন্যায় কাজকেও হালাল ও আসমানের চাদঁকে হাতের মুঠোয় পাওয়ার মতো মানসিক রোগে ভুগছে, ফলস্বরূপ সে মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী আখেরাতের আজাবকে ভুলে গেছে (সূরা তাকাসূর  (১০২) আয়াত ১, ২ : “প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে গাফেল রাখে, এমনকি, তোমরা কবরস্থানে পৌছে যাও”)। মানুষ ভুলে গেছে তার সৃষ্টির আসল উদ্দেশ্য এবং পরকালের চিরন্তন সুখের জীবনকে দূরে ঠেলে দিয়ে দুনিয়ার জীবনের ভোগ-বিলাস, আনন্দ-ফুর্তি, এবং ক্রীড়া-কৌতুকে মেতেছে, মনে করছে এটাই সাফল্য (সূরা আল মুমিনূন (২৩) আয়াত ১১৫ : “তোমরা কি ধারণা কর যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?”; সূরা আল আনকাবুত (২৯) আয়াত ৬৪ : “এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক বৈ তো কিছুই নয়। পরকালের গৃহই প্রকৃত জীবন; যদি তারা জানত”; সূরা আল আনআম (০৬) আয়াত ৩২ : "পার্থিব জীবন ক্রীড়া ও কৌতুক ব্যতীত কিছুই নয়। পরকালের আবাস পরহেযগারদের জন্যে শ্রেষ্টতর। তোমরা কি বুঝ না ?")।  কেন মানুষ সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে আল্লাহ সুবহানাতায়ালার আদেশের প্রতি শৈথিল্য পরায়ণতা দেখাচ্ছে, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিকৃষ্ট পশুর মতো আচরণ করছে, হিংসা, লোভ, হত্যা, পরচর্চা, পরনিন্দা, ও অশ্লীলতাকে পরম পূজনীয় মনে করে আঁকড়ে ধরছে? (সূরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ১৭৯ : “আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ”)। যদিও মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবহানাতায়ালা মানুষকে পরিশ্রমী করে সৃষ্টি করেছেন যাতে মানুষ তার অন্তর, চোখ, ও কানকে কাজে লাগিয়ে সত্য ও ন্যায়কে প্রাধান্য দেয়, তাহলে কেন আজ মানুষের এই দুর্দশা? মুমিনদেরকে তা উপলব্ধি করে কঠোর সংগ্রাম করতে হবে, আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পবিএ কুরআন ও রসুলের বানীকে শুধু প্রচার করলেই হবেনা, তার ব্যাক্ষা উন্মোচন করে সেটিকে বাস্তবায়ন করতে হবে (সূরা আল আনকাবুত (২৯) আয়াত ৬৯ : “যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন”)। উদাহরণস্বরূপ, মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালার আদেশ মেনে (ধনী-গরীব সবাই) প্রতিদিন এক টাকা করে এককোটি লোক অনলাইনে সাদাকা ব্যাংকে সাদাকা করি, তাহলে সমাজের সমস্যা খুব সহজে সমাধান করতে পারি। একইসাথে, মহানবি (সা.) এর কথা শুনে পুরো পেট ভরে না খেয়ে কিছুটা খিদা রেখে খাবার খাই, তাহলে অতিরিক্ত চর্বি মুক্ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারি।

৯. সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআনের আলোকে শৌর্য-বীর্যের মধ্য দিয়ে মুসলিম জাহানের সূচনা হয়েছিল, যা পরবর্তী এক হাজার বৎসর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। প্রথমে মঙ্গল ও ক্রুসেড বাহিনীদের সাথে লড়াই, পরে প্রতারক ও ধূর্ত ইউরোপীয়ান উপনিবেশবাদীদের ধোঁকায় পড়ে একের পর এক মুসলিম সাম্রাজ্যের পতন হয়। এই পতনের মূল কারন হলো মুসলিম শাসকদের পবিত্র কুরআন ও রসুলের সুন্নাহ মোতাবেক কঠোর পরিশ্রম না করা এবং ভোগ বিলাসে মত্ত থাকাতে উৎসাহিত হওয়া। ফলশ্রুতিতে দেশ পরিচালনায় তাদের ন্যায়পরায়ণতা, জ্ঞানচর্চা ও দায়িত্ববোধের অভাব পরিলক্ষীত হয় যা তাদের শাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। এই ধারাবাহিকতায় এক সময়ের দুর্জয় মুসলিম জাতি (সূরা আত তাওবাহ (০৯) আয়াত ১৪ : “যুদ্ধ কর ওদের সাথে, আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন। তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন”; সূরা আল আনফাল (০৮) আয়াত ৬৫ : “হে নবি, আপনি মুসলমানগণকে উৎসাহিত করুন জিহাদের জন্য। তোমাদের মধ্যে যদি বিশ জন দৃঢ়পদ ব্যক্তি থাকে, তবে জয়ী হবে দু’শর মোকাবেলায়। আর যদি তোমাদের মধ্যে থাকে একশ লোক, তবে জয়ী হবে হাজার কাফেরের উপর থেকে তার কারণ ওরা জ্ঞানহীন”), আজ এই বিশ্বে সবদিক (অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, ও সাংস্কৃতিক) থেকে পিছিয়ে থাকা এক জাতি হিসেবে কোনোরকমে বেচে আছে। পদে পদে তারা লাঞ্ছিত, নিগৃহীত, ও জুলুমের শিকার হচ্ছে, যার একমাত্র কারণ মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলার আদেশ ও রসুলের উপদেশ না মানার জন্য। সুদ হারাম সত্ত্বেও, মুসলিম বিশ্ব সুদকে আঁকড়ে ধরে তার অর্থনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনা করছে। মুসলিম উম্মাহ লোভ, হিংসা, ও অহংকারের বেড়াজালে আটকে একতাবদ্ধ হতে পারছেনা। নারী-পুরুষ অবাধ মেলামেশা ও অশ্লীলতা মুসলিম সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আজ মুসলিম ঘরে জন্মগ্রহণ করে ছেলে-মেয়েরা নিজের দ্বিনকে ভুলে কাফের-মুশরিকদের চালচলনে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে (সূরা আল ইমরান (০৩) আয়াত ৯০, ৯১ : “যারা ইমান আনার পর অস্বীকার করেছে এবং অস্বীকৃতিতে বৃদ্ধি ঘটেছে, কস্মিনকালেও তাদের তওবা কবুল করা হবে না। আর তারা হলো গোমরাহ। যদি সারা পৃথিবী পরিমাণ স্বর্ণও তার পরিবর্তে দেওয়া হয়, তবুও যারা কাফের হয়েছে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের তওবা কবুল করা হবে না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব! পক্ষান্তরে তাদের কোনোই সাহায্যকারী নেই”)। তাই, আজ মুমিনদেরকে শপথ নিতে হবে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলার দ্বিনকে সমুন্নত রাখার (সূরা আল জাসিয়া (৪৫) আয়াত ৩৫, ৩৬, ৩৭ : “এটা এজন্যে যে, তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করেছিলে এবং পার্থিব জীবন তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিল। সুতরাং আজ তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে না এবং তাদের কাছে তওবা চাওয়া হবে না। অতএব, বিশ্বজগতের পালনকর্তা, ভূ-মণ্ডলের পালনকর্তা ও নভোমণ্ডলের পালনকর্তা আল্লাহর-ই প্রশংসা। নভোমণ্ডলে ও ভূ-মণ্ডলে তাঁরই গৌরব। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”)।

১০. মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলা আমাদেরকে শ্রমনির্ভর করে সৃষ্টি (সূরা আল বালাদ (৯০) আয়াত ০৪ : “নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি”) করেছেন, যাতে পরিশ্রম করে আয় রোজগার করে জীবন অতিবাহিত করতে পারি। সেজন্য, মুমিনদেরকে সবসময় মনে রাখতে হবে, রিজিকের মালিক মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলা এবং তার নির্দেশ মেনেই রোজগারের অর্থ ব্যয় করতে হবে। মুমিনদেরকে অবশ্যই হালাল রোজগার করতে হবে এবং যদি রোজগারের অর্থ জাকাতের নিসাব মানদণ্ডে পড়ে, তবে জাকাত আদায় করতে হবে। মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলার রহমতে পিতা-মাতার মাধ্যমেই একটি শিশুর এই দুনিয়াতে আগমন ঘটে। পিতা-মাতা অনেক কষ্ট ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে শিশুটিকে বড়ো করে তোলেন এবং সে (শিশুটি) পরিশ্রমের দ্বারা অর্থ উপার্জন করতে শুরু করে। তাই, সন্তানদের রোজগারের অন্যতম হকদার হলো বাবা-মা। বাবা-মায়ের বৃদ্ধকালে তাদের ভরণপোষণ ও সেবা-শুশ্রূষা করা সন্তানের জন্য ফরজ কাজ, যার ব্যত্যয়ে মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলার আরশ কেঁপে উঠে। আমরা মুমিনেরা যেন কখনই তা না করি। একইসাথে, মুমিনদেরকে তাদের আয়ের কিছু অংশ মহান আল্লাহ সুবহানাতাআলার প্রতি ভালোবাসায় আত্মীয়-স্বজন (যাদের সাথে রক্তের সম্পর্ক রয়েছে), পাড়া-প্রতিবেশী (যারা খুব নিকটে বাস করে), অভাব-অনটনে জর্জরিত ব্যক্তি (সবসময় যাদের অর্থনৈতিক বিপদ লেগেই থাকে), এতিম-অনাথ (যে-সব শিশুর পিতা-মাতা নেই), ফকির-মিসকিন (যারা চরম দরিদ্রতায় দিনযাপন করছেন), মুক্তিকামী ক্রীতদাস (বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে যে-সব ব্যক্তি অপহরণের শিকার হয়ে মুক্তিপণের অর্থের জন্য মিনতি করছেন), এবং মুসাফিরদের (যে ব্যক্তি সফরে বের হয়ে অর্থের অভাবে বাড়ি ফিরতে পারছেন না) জন্য ব্যয় করতে হবে (সূরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২১৫ : “তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, কি তারা ব্যয় করবে? বলে দাও-যে বস্তুই তোমরা ব্যয় কর, তা হবে পিতা-মাতার জন্যে, আত্মীয়-আপনজনের জন্যে, এতিম-অনাথদের জন্যে, অসহায়দের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। আর তোমরা যে কোন সৎকাজ করবে, নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত ভালোভাবেই আল্লাহর জানা রয়েছে”; সূরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২১৫ : “সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে মুখ করবে, বরং বড়ো সৎকাজ হলো : এই যে, ইমান আনবে আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবি-রসুলগণের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণকারী তারাই হল সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেজগার”)।

১১. মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার দয়ায়, জ্ঞান বিজ্ঞানের এই যুগে, তথ্য-প্রযুক্তির (ইন্টারনেট ও মোবাইল) বদৌলতে মানুষ আজ সারা বিশ্বব্যাপী পদাচরণের এক অভাবনীয় সুযোগ পেয়েছে। এই তথ্য-প্রযুক্তির সুফল কল্পনাতীত। যোগাযোগের ক্ষেত্রে, আজ আমরা খুব সহজ ও দ্রুততার সঙ্গে (ই-মেইল, ভিডিও কল, চ্যাট) দূর-দূরান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করতে পারছি। শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে, ইন্টারনেট ব্যবহার করে যে-কোনো বই ও তথ্য পড়তে পারছি এবং অনলাইনে ক্লাস করতে পারছি। ব্যাবসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে, ঘরে বসে অনলাইনের মাধ্যমে ব্যাবসা পরিচালনা ও চাকরি করতে পারছি। অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে, অনলাইনে চিকিৎসকের পরামর্শ, বিল পরিশোধ ও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারছি। অর্থাৎ, পৃথিবীটা যেন তথ্য আদান-প্রদানের এক বিশাল ডাটাবেজে পরিগণিত হয়েছে, যেটার পরিচালনা মানুষই করছে ডাটা দেওয়া ও নেয়ার মাধ্যমে। এই বিস্ময়কর ডাটা আদান-প্রদানে মানুষ খুবই অভ্যস্ত এবং এটিকে সে ভালোবাসে, কারণ এটি তার জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। অথচ আজ মানুষের আচরণ দেখলে মনে হয় সে ভুলে গেছে, তার আমলনামা (ডাটাবেজ) দু-কাঁধের ফেরেশতারা লিপিবদ্ধ করে রাখছে। এই আমলনামার উপর ভিত্তি করেই পরকালে মানুষের বিচার হবে এবং এই বিচারের উপর ভিত্তি করে মানুষ জান্নাত এবং জাহান্নাম লাভ করবে। তাই, মুমিনদেরকে সতর্ক থাকতে হবে কোনোভাবেই যেন কোনো অন্যায় চিন্তা মনে স্থান না পায়, কারণ তা যদি স্থান পায় এবং মুমিনরা তা উচ্চারণ ও আমল করে বসে, তবে সেটি সাথে সাথেই মুমিনদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হয়ে যায় (সুরা ক্বাফ (৫০) আয়াত ১৬, ১৭, ১৮ : “আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি থেকেও অধিক নিকটবর্তী। যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্যে তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে”)। আমাদের মনে উদয় হওয়া চিন্তার খবর অন্তর্যামী মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালাই একমাত্র জানেন। জিন শয়তানের অদৃশ্য জ্ঞান নেই, তবে শয়তান খারাপ কাজের জন্য উসকে দেয়, কিন্তু মানুষ তা গ্রহণ করবে কি না, তা ব্যক্তির নিজের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।

১২. মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা ফিতনা বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করাকে হত্যার চেয়েও বেশি মারাত্মক অপরাধ বলে পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন। কেন ফিতনা এত বড়ো অপরাধ তার কারণগুলো আমরা কি ভেবে দেখেছি? একজন ব্যক্তিকে হত্যা করলে তার জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু ফিতনা বা দাঙ্গা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে পুরো সমাজকে ধ্বংস করে দেয়; ফিতনা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা আনয়ন করে, যার পরিণামে সমাজে রক্তপাত বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যায়; ফিতনা মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও ঐক্যের বন্ধন ভেঙে সমাজে শান্তি বিনষ্ট করে, এবং ফিতনা মানুষের ইমান ও নৈতিকতা নষ্ট করে, ধর্মীয় ক্ষতির মাধ্যমে মানুষকে ভুল পথে চালিত করে। তাই, সমাজে ফিতনা বন্ধ করতে হলে, তা শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। ফিতনা সৃষ্টি হয় লোভ-লালসা ও অন্যায় থেকে। আজকাল বেশিরভাগ পরিবারে বোনদের উত্তরাধিকার সম্পদের উপর চরম জুলুম করছে সেই পরিবারের লোভী ভাইয়েরা। বাবা মারা গেছেন বিশ-পঁচিশ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু সম্পদের বণ্টন হচ্ছে না। তারপর ভয়-ভীতি ও প্রতারণা করে সম্পদ (জমি) কমমূল্যে বোনদের কাছ থেকে কিনে নেওয়া। ওয়ারিশ দাবি করলে ভাবখানা এমন করা যেন এটি একটা লজ্জা শরমের ব্যাপার। সর্বোপরি, এই প্রতারক ও ভয়ংকর লোভী ভাইয়েরা বোনদের হক চাওয়াকে খারাপ নজরে হিসাবে সমাজে জাহির করে বেড়ায়। বোনদের উত্তরাধিকার সম্পদের হকে ভাইদের এই চরম ফিতনায় বোনদের হৃদয়ে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে, যা তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেবার চেয়েও ভয়ংকর অপরাধ (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ১৯১ : “আর তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে। বস্তুত ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ। আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে। অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে। তাহলে তাদেরকে হত্যা কর। এই হল কাফেরদের শাস্তি”; সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২১৭ : “সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও, এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড়ো পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতায় সৃষ্টি করা এবং কুফরি করা, মসজিদে-হারামের পথে বাধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিষ্কার করা, আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড়ো পাপ। আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহা পাপ। বস্তুত তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদেরকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়। তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো দোজখবাসী। তাতে তারা চিরকাল বাস করবে”)। এই ব্যাপারে মুমিনদেরকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। ফিতনা থেকে বাঁচতে লোভ-লালসা থেকে দূরে থাকতে হবে, সৎপথে চলতে হবে, এবং দুনিয়ার খুব স্বল্প উপভোগের (উত্তরাধিকার সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ) চেয়ে আখিরাতের হিসাবকে বেশি ভয় করতে হবে। তা ছাড়া, যে-সব ভাইয়েরা বোনদের সম্পদ গ্রাস করেছ, মনে রেখো, হাশরের ময়দানে তোমাদের সব নেকি বোনদের দিয়ে দেওয়া হবে এবং তাদের পাপসমূহ তোমাদের উপর চাপানো হবে। অতঃপর তোমাদেরকে (ভাইদের) জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮১ : “প্রকৃত নিঃস্ব বা দেউলিয়া সে ব্যক্তি, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে, অথচ দুনিয়াতে সে কাউকে গালি দিয়েছে, মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ ভক্ষণ করেছে, কাউকে হত্যা বা আঘাত করেছে। তখন তার নেক আমল থেকে পাওনাদারদেরকে দেওয়া হবে। পাওনা পরিশোধের আগেই তার নেক আমল শেষ হয়ে গেলে, পাওনাদারদের পাপ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে”)।

১৩. পরিকল্পিত জুলুমের মাধ্যমে মানুষের হক নষ্ট করা আজ সমাজে বেড়েই চলেছে। জুলুম একটি ঘৃণ্য অপরাধ। পরাক্রমশালী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা জুলুমকারীদের উপর খুবই ক্রুদ্ধ, তাই মুমিনদেরকে মজলুমকে সাহায্য এবং জালিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে জুলুমকারীদেরকে সমাজ থেকে সমূলে উৎপাটন করতে জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করতে হবে। পরাক্রমশালী মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা অভয় দিয়েছেন, জুলুমে শিকার ব্যক্তির প্রতি তার কোনো অভিযোগ নেই, যদি সে জুলুমকারীদের বিরুদ্ধে জুলুমের প্রতিশোধ নেয়। একসময়ের প্রতাপশালী, জুলুমকারী (উত্তরাধিকার সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগকারী) আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। সমাজের প্রতিবাদী মানুষ আজ জুলুমের প্রতি সোচ্চার। জুলুমে শিকার ব্যক্তি ইচ্ছা করলেই জুলুমকারীদের বিরুদ্ধে কড়ায়-গন্ডায় প্রতিশোধ নিতে পারে, জুলুমকারীদের নিঃসহ করে জেল জরিমানা করতে পারে। দয়াময় মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা জুলুমকারীদের এই নির্মম দিনে যৌক্তিক প্রতিশোধ নিতে বলেছেন এবং একইসাথে সবর করতে বলেছেন। ইসলামের সৌন্দর্য এটাই। যদিও জুলুমকারীদের জন্যে আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, তবে তওবা করে, ক্ষমা চেয়ে মজলুমকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে দয়াবান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার কৃপা পেতেও পারেন (সুরা আশ শুরা (৪২) আয়াত ৪১, ৪২ : “নিশ্চয় যে অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের উপর অত্যাচার চালায় এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি”; সুরা নাহল (০২) আয়াত ১২৬, ১২৭ : “আর যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তবে ঐ পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমাদেরকে কষ্ট দেওয়া হয়। যদি সবর কর, তবে তা সবরকারীদের জন্যে উত্তম। আপনি সবর করবেন। আপনার সবর আল্লাহর জন্য ব্যতীত নয়, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না এবং তাদের চক্রান্তের কারণে মন ছোট করবেন না”)। সুতরাং, মুমিনরা যেন কখনোই জুলুমের ধারে কাছে না যায়, কারণ জালিমরা সবসময় পরাক্রমশালী, আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার কাছে অভিশপ্ত ও মানুষের কাছে ঘৃণিত। মজলুমের (অত্যাচারিত ব্যক্তির) আর্জি মহান সুবাহনাতায়ালার দরবারে তড়িৎগতিতে পৌঁছে যায়, যার মাঝে কোনো পর্দা থাকে না। ইতিহাস সবসময় বলে যারা অহংকার ও ক্ষমতার মোহে মানুষের ওপর নির্যাতন চালায়, তাদের বিনাশ অনিবার্য।

১৪. ইসলামের দৃষ্টিতে দান-সদকা ও হাদিয়া অত্যন্ত পবিত্র ও মহান ইবাদত। নিজের কষ্টের উপার্জনের একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করলে দয়াবান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা বান্দার উপর খুবই খুশী হন। এতে বান্দার মন পবিত্র হয় এবং সমাজের প্রতি তার ভালোবাসার বন্ধন ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব দৃঢ় হয়। মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে, দান-সদকা ও হাদিয়ার সর্বপ্রথম হকদার হলেন বাবা-মা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণ। দ্বিতীয় হকদার হলেন নিকটাত্মীয় বা আত্মীয়-স্বজন, যারা সবসময় সুখে-দুঃখে পাশে থাকেন। তা ছাড়া, দান-সদকা ও হাদিয়ার অন্যান্য হকদার হলেন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশের মানুষ : এতিম (পিতা বা অভিভাবক নেই এবং সহায়-সম্বলহীন), অসহায় (বড়ো কোনো বিপদে পড়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন), দরিদ্র ও অভাবী (পর্যাপ্ত আয় নেই), যাদের প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করা অত্যন্ত কষ্টকর। তবুও, অনেকসময় দেখা যায় আত্মীয়স্বজন ও পরিবারকে বাদ দিয়ে অনেকে দূরে দান করাকে বেশী প্রাধান্য দেন এবং উৎসাহিত হন, যা কখনই কাম্য নয়, কারণ ইসলামের মূল শিক্ষাই হলো : পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের হক আগে আদায় করা। মুমিনদের জানা উচিত, দান-সদকা ও হাদিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি পাপ মোচন করে (পানি দিয়ে যেমন : আগুন নেভানো যায়, তেমনি সৎভাবে দেওয়া সদকা দিয়ে পাপ মুছে ফেলা যায়) , সম্পদে বরকত আনে (দান করলে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা দানকারী ব্যক্তির সম্পদে বরকত বাড়িয়ে দেন) , বিপদ দূর হয় (নিয়মিত দান-সদকা বিপদ থেকে রক্ষা করে) , বহুগুণ সওয়াব হয় (মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা দানের প্রতিদান হিসাবে বহু গুণ, যা সাতশ বা তারও বেশি বাড়িয়ে দেন), এবং বুকের প্রশস্ততা বাড়ে (দান-সদকা ও হাদিয়া ব্যক্তির মনের কৃপণতা দূর করে উদারতা তৈরি করে)। তবে এটা খুবই পরিতাপের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় যখন দানকারী নিজ সম্মান রক্ষার্থে দান-সদকা অনেকটা লোক-দেখানো ও সমাজের চাপে পড়ে করেন। ফলে, দানকারী তার দান-সদকা ও হাদিয়া নিয়ে সবসময় অহংকার, ঝগড়া-বিবাদ, খোঁটা দিয়ে গ্রহীতাকে প্রতিনিয়তই কষ্ট দেন, যা খুবই অমানবিক ও জঘন্য কাজ। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের হক আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক দানকারীর এ ধরনের আচরণ লক্ষ্য করা যায়। এর মূল কারণ, দানকারী ব্যক্তির শরীয়াহ (পবিত্র কুরআন ও হাদিস) জ্ঞানের অভাব ও অন্তরের খাঁটি নিয়ত না থাকা (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২৬৪ : “হে ইমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাত বরবাদ করো না সে ব্যক্তির মতো যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব, এ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার উপর কিছু মাটি পড়েছিল। অতঃপর এর উপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হলো, তারপর তাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। তারা ঐ বস্তুর কোন সওয়াব পায় না, যা তারা উপার্জন করেছে। আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না”)। সুতরাং, আমরা মুমিনেরা যেন কখনই দান-সদকা ও হাদিয়ার মতো মহৎ কাজকে ঝগড়া-বিবাদ ও খোঁটা দিয়ে যেন বরবাদ করে না দিই।

১৫. মুমিনদেরকে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার জ্ঞানগর্ভ পবিত্র কুরআনের কথা, যার মধ্যে গভীর জ্ঞান ও উপদেশ নিহিত রয়েছে, তা নিখুঁতভাবে অনুধাবন করতে হলে চিন্তাশীল হতে হবে। এজন্য, মুমিনদেরকে জানতে হবে গভীর জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য এবং তা কীভাবে অর্জন করতে হবে। গভীর জ্ঞানের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো : জ্ঞানের মূল কারণ অনুধাবন করা (জ্ঞানের প্রতিটি বিষয়ের গভীরে যেতে নিজেকে প্রশ্ন করা 'কেন' ও 'কীভাবে' তা স্পষ্টভাবে জানা), সেই জ্ঞানের স্থায়ী প্রভাব কী (যে জ্ঞান মানুষের অন্তরে গভীর রেখাপাত করে তার চিন্তা, আচরণ ও জীবনকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয় এবং একইসাথে যেটিকে সে সহজে ভুলে যায় না ও মনে দীর্ঘস্থায়িত্ব পায়), জ্ঞানের বিশ্লেষণ ক্ষমতা যাচাই (কোনো জটিল তথ্য, ধারণা বা সমস্যাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে তার ভেতরের আসল সত্য, ভুল ধারণা, কার্যকারণ এবং সঠিক ও ভুল দিক আলাদা করার দক্ষতা), এবং জ্ঞানের প্রয়োগ দক্ষতা (অর্জিত তথ্য বা তত্ত্বকে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে সফলভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতাই হলো জ্ঞানের প্রয়োগ দক্ষতা। শুধু বই পড়া ও তথ্য মুখস্থ করা নয়, বরং এটাকে কর্মক্ষেত্রে ও দৈনন্দিন প্রয়োজনে কাজে লাগানোই হলো আসল দক্ষতা)। অন্যদিকে, গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হলে মুমিনদেরকে নিয়মিত বই পড়তে হবে (পবিত্র কুরআন, হাদিস, এবং মানসম্মত ইসলামিক বই ও অন্যান্য বিজ্ঞান ও গবেষণা প্রবন্ধ পড়া), গবেষণায় মন রাখতে হবে (প্রতিটি তথ্যের সত্যতা যাচাই করে এর বিপরীতে প্রশ্ন করার অভ্যাস রাখা), ধৈর্য ও সময় নিয়ে পড়তে হবে (তাড়াহুড়ো না করে দীর্ঘ সময় নিয়ে কোনো বিষয়ে অধ্যয়ন করা) এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে (তাত্ত্বিক পড়ার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা থেকে শেখা)। মুমিনদেরকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য ভালো ও মন্দ কাজ করার ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এজন্য যুগে যুগে নবি-রসুল প্রেরন করেছেন যাতে মানুষ মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালাকে রব হিসেবে মেনে ভালো কাজ করে, অন্যথায় নূহ নবির জাতি ও আদ জাতির মত চরম শাস্তি আমাদেরকেও এদুনিয়াতে ভোগ করতে হবে, পরকালে জাহান্নামের শাস্তি তো রয়েছেই   (সুরা আল কামার (৫৪) আয়াত ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭ : “আমি নূহকে আরোহণ করালাম এক কাষ্ঠ ও পেরেক নির্মিত জলযানে। যা চলত আমার দৃষ্টি সামনে। এটা তার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ ছিল, যাকে প্রত্যখ্যান করা হয়েছিল। আমি একে এক নিদর্শনরূপে রেখে দিয়েছি। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি? কেমন কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী। আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?”; সুরা আল কামার (৫৪) আয়াত ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২ : “আদ সম্প্রদায় মিথ্যারোপ করেছিল, অতঃপর কেমন কঠোর হয়েছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী। আমি তাদের উপর প্রেরণ করেছিলাম ঝঞ্জাবায়ু এক চিরাচরিত অশুভ দিনে। তা মানুষকে উৎখাত করছিল, যেন তারা উৎপাটিত খর্জুর বৃক্ষের কান্ড। অতঃপর কেমন কঠোর ছিল আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী। আমি কোরআনকে বোঝার জন্যে সহজ করে দিয়েছি। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?”)। অতএব, মুমিনদেরকে বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে এবং চিন্তাশীল মন নিয়ে পবিএ কুরআন পাঠ করতে হবে যাতে দুনিয়া ও আখেরাতে সাফল্য লাভ করা যায়।

১৬. মানুষ যদিও মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, যাকে দেওয়া হয়েছে বিবেক, বুদ্ধি, ও ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা, তবুও মানুষ খুবই ভীরু মানসিক প্রকৃতি ও সহজাত দুর্বল হিসেবে সৃজিত হয়েছে। তাই, এই মানুষ যখন বিপদ বা কষ্টের মধ্যে নিপতিত হয়, তখন অধৈর্য ও হতাশ হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ও অতিরিক্ত হা-হুতাশে দিশেহারা হারিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। অথচ, সেই হা-হুতাশ করা মানুষ যখন সুখ, সম্পদ বা কল্যাণ পায়, তখন সে ভুলে যায় তার অতীত এবং মনে করতে থাকে এসবই আমার, আমিই এগুলো অর্জন করেছি, এই সম্পদ আমাকে অমর করে রাখবে, আমি কখনই এর এতটুকু কাউকে দেবো না (সুরা আল মাআরিজ (৭০) আয়াত ১৯, ২০, ২১ : “মানুষ তো সৃজিত হয়েছে ভীরুরূপে। যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে হা-হুতাশ করে। আর যখন কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তখন কৃপণ হয়ে যায়”)। অবশ্য প্রকৃত মুমিনেরা যারা নামাজি ও দানশীল মানুষ তারা ব্যতিক্রম। সুখ, সম্পদ বা কল্যাণ কখনই তাদেরকে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার রাস্তায় ব্যয় করা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনা। মুমিনেরা সুখে-দুখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বজায় রাখতে পছন্দ করে, যাতে দয়াময় আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার রাস্তায় সবসময় ব্যয় করার মাধ্যমে তার অসীম কৃপা লাভ করা যায় (সুরা আল মাআরিজ (৭০) আয়াত ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ : “তবে তারা স্বতন্ত্র, যারা নামাজ আদায়কারী। যারা তাদের নামাযে সার্বক্ষণিক কায়েম থাকে এবং যাদের ধন-সম্পদে নির্ধারিত হক আছে, যাঞ্চাকারী ও বঞ্চিতের এবং যারা প্রতিফল দিবসকে সত্য বলে বিশ্বাস করে”)। সেজন্য মুমিনেরা কখনও ভয় ও চিন্তান্বিত হয় না, কারণ তারা জানে এসবই পরাক্রমশালী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার পরীক্ষা। দুনিয়ার এই পরীক্ষাগারের পরীক্ষায় মুমিনেরা সফলকাম হয়েছে তাদের ইমান ও আমলের (মন ও শরীর দিয়ে একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করা, সব ধরনের অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকা, নিয়মিত নির্ধারিত জাকাত আদায় করা, নিয়মিত সদকা প্রদান করা, নিজেদের পবিত্রতা ও চরিত্র রক্ষা করা, এবং আমানত ও ওয়াদা রক্ষা করা) ওপর অবিচল থেকে (সুরা ইউনুস (১০) আয়াত ৬২ : “মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোন ভয় ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে”; সুরা আল মুমিনূন (২৩) আয়াত ০১ : “মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে”; সুরা হামীম সেজদাহ (৪১) আয়াত ৩০ : “নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন”)। চিন্তাশীল মুমিনেরা উপলব্ধি করতে পারে, পরাক্রমশালী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালাই আমাদের রিজিকদাতা এবং সম্পদ-অভাব, ভালো-মন্দ তারই সৃষ্টি; তাই মুমিনদের সম্পদে রয়েছে অভাবীদের হক। মুমিনেরা কখনই দরিদ্রদের খাওয়াতে কার্পণ্য করেন না  (সুরা ইয়াসীন (৩৬) আয়াত ৪৭ : “যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় কর। তখন কাফেররা মুমিনগণকে বলে, ইচ্ছা করলেই আল্লাহ যাকে খাওয়াতে পারতেন, আমরা তাকে কেন খাওয়াব? তোমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পতিত রয়েছ”)।

১৭. মুমিনদেরকে কেয়ামতের ভয়াবহতা ও হাশরের ময়দানের চরম বাস্তবতা সম্পর্কে সতর্ক থেকে অবশ্যই দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করতে হবে। অন্যথায় সেদিন এমন কঠোর সংকটের মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তিকে যেতে হবে, যেখানে ব্যক্তিটি দুনিয়ার প্রিয় বাবা-মা, ভাই, স্ত্রী-সন্তান হতেও পলায়ন করতে চাইবে, কারণ সে দুনিয়াতে মুমিনের জীবনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি বা তাচ্ছিল্যতা প্রদর্শন করেছিল। একজন ব্যক্তির পরিবারের মধ্য দিয়েই এই পৃথিবীতে আগমন ঘটে। ব্যক্তিটি ছোট ও কৈশোর বেলায় হয়ত বাবা-মায়ের কথা শুনত না এবং বাবা-মায়ের কাজে সাহায্য করতো না। বড়ো হয়ে হয়ত ব্যক্তিটি বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দিত না। আবার ভরণপোষণ দিলেও সবসময় হিংসা-অহংকার করত, ঝগড়া-বিবাদ করত, খোঁটা দিত এ বলে যে, সে এই পরিবারে না থাকলে পরিবারটি ডুবে যেত। অথচ সে ভুলে যায় তার বাবা-মায়ের সীমাহীন ভালোবাসা ও অবদানের কথা, যার জন্য সে আজ বড়ো হয়েছে ও রোজগার করতে পারছে। শুধু এখানেই শেষ নয়, ব্যক্তিটি মনে করে পরিবারের উত্তরাধিকার সম্পত্তির মালিক (যেটি অর্জিত হয়েছে পরিবারের সব সদস্যের মিলিত পরিকল্পনা ও শ্রমে) একমাত্র সে, যেহেতু সে পরিবারে বাবা-মায়ের বৃদ্ধ বয়সে ভরণপোষণ দিয়েছে। সর্বোপরি, সে তার পারিবারিক (স্ত্রী-সন্তান) জীবনকে মুমিনের জীবনে অতিবাহিত করার প্রতি চরম উদাসীন, এবং দুনিয়ার চাকচিক্যময় জীবনের প্রতি সীমাহীন আকৃষ্ট অনুভবকারী (সুরা আবাসা (৮০) আয়াত ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭ : “অতঃপর যেদিন কর্ণ বিদারক নাদ আসবে, সেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভ্রাতার কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে”)। তাই, মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে প্রকৃত মুমিন হতে হলে যে পরিবারে তিনি বড়ো হয়েছেন সে পরিবারের (বাবা-মা, ভাই-বোন) কল্যাণের জন্য ব্যয় করতে হবে, একইসাথে নিজের পরিবারকে (স্ত্রী-সন্তান) শরীয়াহ (পবিত্র কুরআন ও হাদিস) মোতাবেক পরিচালিত করতে হবে। তাহলেই কেয়ামত দিন ও হাশরের ময়দানে মুমিনরা নেককার বান্দা হিসেবে তাদের চেহারাগুলো অত্যন্ত আনন্দিত, উজ্জ্বল, হাসিমুখ ও সন্তুষ্ট থাকবে। তাদের এই আনন্দের কারণ হলো দুনিয়ার সৎকর্মের প্রতিদান হিসেবে জান্নাত প্রাপ্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন (সুরা আবাসা (৮০) আয়াত ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২ : “অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে উজ্জ্বল, সহাস্য ও প্রফুল্ল এবং অনেক মুখমণ্ডল সেদিন হবে ধুলি ধূসরিত। তাদেরকে কালিমা আচ্ছন্ন করে রাখবে। তারাই কাফের পাপিষ্ঠের দল”)। অন্যদিকে, যারা হিংসা-অহংকার, ঝগড়া-বিবাদ, ও খোঁটা দিয়ে পরিবারের শান্তি বিনষ্ট করত, তাদের মুখমণ্ডল হবে মলিন এবং ঠিকানা হবে জাহান্নাম। অতএব, আমরা মুমিনেরা যেন দুনিয়ার পরীক্ষায় বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন করে কাজ করি এবং শয়তানের ধোঁকায় না পড়ি।

১৮. বর্তমানের মুসলিম সমাজ ইসলামের প্রথম যুগের (স্বর্ণযুগ তথা রসুলুল্লাহ সা. ও সাহাবায়ে কেরামের আমল) এবং পরবর্তী যুগের (তাবেঈ, তাবে-তাবেঈ ও সালাফে সালেহীনদের আমল) ইসলামি সমাজের আদর্শ হতে অনেকটাই বিচ্যুতির দিকে ধাবিত হয়েছে যা মুমিনদেরকে তাদের বিশুদ্ধ ইমান ও সঠিক আকিদা (পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোকে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা এবং নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া) রক্ষায় যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ গুলো হচ্ছে : প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব ও পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবিদের অনুসৃত পথ সম্পর্কে সঠিক ও গভীর জ্ঞান অর্জন না করা; মুসলিম সমাজে অপসংস্কৃতির প্রভাব, যা ইসলাম-বহির্ভূত ও পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ; মুসলিমদের বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে ভিন্ন উপাখ্যান ও বিদআতের বিস্তার, যা দ্বিনের মূল উৎসের চেয়ে মনগড়া ও ভিত্তিহীন প্রথার দিকে ঝুঁকে পড়া; মুসলিমদের ভিন্ন মতভেদ ও দলাদলি, যা ইসলামের মৌলিক বিষয়ের চেয়ে শাখা-প্রশাখামূলক বিষয় নিয়ে চরম কোন্দলে লিপ্ত হওয়া; এবং আধুনিক মিডিয়ার নেতিবাচক ব্যবহার, যা ইন্টারনেটে ছদ্মবেশী সংশয়বাদ ও নাস্তিক্যবাদের প্রচার, যেটি তরুণদের মনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ও পরবর্তী প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যদিও এগুলোর দেখভালের কথা সমাজপতি, আলেমসমাজ, ধনী সমাজ, ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ও দায়িত্বশীলবর্গের। কারণ তারা সমাজের ও রাষ্ট্রের নেতা। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক তাদেরকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা উচিত ছিল। যেহেতু তারা ইসলামি সমাজে বিশুদ্ধ ইমান ও সঠিক আকিদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই যারা তাদের কথা ও উপদেশ শুনে অনৈসলামিক কাজ করবে, তাদেরকে কেয়ামতের ময়দানে যখন জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা লজ্জা ও অনুতাপের সাথে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে বলবে : “হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নেতা ও বড়োদের কথা মেনে চলেছিলাম। তারা ছিল আমাদের সমাজের খুবই প্রভাবশালী ব্যক্তি, যাদেরকে আমরা অনুসরণ করতাম। কিন্তু তারা আমাদেরকে বিশুদ্ধ ইমান ও সঠিক আকিদার পথ থেকে বিচ্যুত করে কুফরের প্রতি আসক্তিতে নিমজ্জিত করেছিল। আমরা ভুল করে তাদের অন্ধ অনুসরণ করেছিলাম বলে আজ এই শাস্তির সম্মুখীন হয়েছি। সুতরাং, হে মহান রব, আপনি আজ তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন। তাই, যে-সব মুমিনেরা সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন আছেন, আপনারা পবিত্র কুরআন ও সুন্নত আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করুন, অন্যথায় আপনাদের শাস্তি হবে দ্বিগুণ থেকে বহুগুণ (সুরা আল আহযাব (৩৩) আয়াত ৬৭, ৬৮ : “তারা আরও বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা আমাদের নেতা ও বড়োদের কথা মেনেছিলাম, অতঃপর তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের পালনকর্তা! তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদেরকে মহা অভিসম্পাত করুন”)। এটা সত্য যে মানুষের জীবনে নেতা ও বড়োদের প্রভাব অপরিসীম। যদি নেতারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হন, তবে তাদের অনুসারীরাও পথভ্রষ্ট হবেন এটাই স্বাভাবিক। তাই মুমিনেরা কখনই কোনো মানুষের কথা মেনে নেবেননা : সে যেই হোকনা কেন, যদিনা তা মহান আল্লাহ সুবানাতায়ালা ও তাঁর রসুলের নির্দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। মহান আল্লাহ সুবানাতায়ালা আদেশের বিপরীতে কোনো মানুষের আনুগত্য জায়েজ নয়। তাই, কেয়ামতের দিন কোন অজুহাত দেখিয়ে কোনো কাজে আসবে না। কারণ, যারা অন্যায়ের পথে নেতৃত্ব দেয় এবং যারা তাদের অনুসরণ করে— উভয়ই জাহান্নামের শাস্তির সম্মুখীন হবে। তাই আমাদের উচিত নিজেদেরকে এমন নেতা ও বন্ধু নির্বাচন করা, যারা আমাদেরকে আল্লাহর পথের দিকে আহ্বান করে, পথভ্রষ্টতার দিকে নয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে সত্যের অনুসারী হওয়ার তাওফীক দান করুন এবং এমন নেতা-বড়োদের থেকে হেফাজত করুন, যারা আমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে (সুরা আল আহযাব (৩৩) আয়াত ৭০, ৭১ : “হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে”)।

১৯. মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা আমাদের মালিক। পবিত্র কুরআন সর্বশক্তিমান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার আদেশ সংবলিত কিতাব যা মুমিনদেরকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে যদি তারা দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হতে চায়। অবশ্যই মুমিনদেরকে রিজিকদাতা আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করতে হবে সমাজ (সমাজে সঠিক দ্বিনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা) ও মানুষের (গরিব-দুঃখী ও মানবতার কল্যাণে অর্থ ব্যয়) কল্যাণে। অবশ্যই মুমিনদেরকে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার পথে তাদের সম্পদ ব্যয়ে কৃপণতা পরিহার করতে হবে, অ্ন্যথায় মুমিনেরা নিজেদের ক্ষতিই ডেকে আনবে, কারণ তখন সমাজ হবে ন্যায়নিতীহীন ও পাপে পূর্ণ। একটা ন্যায়নিতীহীন ও পাপে পূর্ণ সমাজে কীভাবে মুমিনেরা পবিত্র ও ন্যায়ের জীবন যাপন করবে। মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা কারো মুখাপেক্ষী নয়। তিনি সবার থেকে মুক্ত ও অভাবমুক্ত আর মানুষ সবকিছুর জন্য মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার ওপর নির্ভরশীল ও অভাবগ্রস্ত। তাই, যারা আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার পথে ব্যয় করতে কৃপণতা করে, তারা মূলত নিজেদেরই ক্ষতি করে, কারণ তারা অফুরন্ত নেক ও সওয়াব লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। সর্বজ্ঞানী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা মুমিনদেরকে সতর্ক করেছেন এই বলে যে : যদি মুমিনদের কোন জাতি মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার নির্দেশ অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে সর্বশক্তিমান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা এমন এক জাতিকে স্থলাভিষিক্ত করবেন যারা তাদের মতো অবাধ্য বা কৃপণ হবে না, বরং তারা আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার আনুগত্য করবে এবং জান প্রাণ দিয়ে দ্বিনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা সমুন্নত রাখবে (সুরা মুহাম্মদ (৪৭) আয়াত ৩৮ : “শুন, তোমরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার আহ্বান জানানো হচ্ছে, অতঃপর তোমাদের কেউ কেউ কৃপণতা করছে। যারা কৃপণতা করছে, তারা নিজেদের প্রতিই কৃপণতা করছে। আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, এরপর তারা তোমাদের মত হবে না”; সুরা আল মায়েদাহ (০৫) আয়াত ৫৪, ৫৫, ৫৬ : “হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ-তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী। তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল এবং মুমিনবৃন্দ-যারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ তাঁর রসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী”)। অতএব, মুমিনেরা যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামি অর্থনৈতিক কার্যকলাপে (জাকাত, সদকা, কর্জে হাসানা, ও হাদিয়া) অংশগ্রহণ করে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার দ্বিনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকে।

২০. মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে সৃষ্টির পর নিয়ামতের জান্নাতের অধিবাসী করেছিলেন। কিন্তু ইবলিস শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার আদেশ পালনে ব্যর্থ হয়ে মানুষের আদি পিতা-মাতা নিয়ামতের জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়ে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। কিন্তু এই পৃথিবী তাদের জন্য জান্নাতের মতো চরম সুখের বাসস্থান ছিল না বরং ছিল কঠোর পরিশ্রমের এক পরীক্ষাগার। তাদের মাধ্যমেই এই পৃথিবীতে মানুষের আগমন। তাই, যে মানুষ এই পৃথিবীতে ন্যায়-অন্যায়ের পরীক্ষায় সফলকাম হতে পারবে, সে পুনরায় জান্নাতের অধিবাসী হতে পারবে, অন্যথায় পৃথিবীতে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম। তাই, মুমিনদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হতে হলে তাদেরকে বিবেক-বুদ্ধি ও গভীর চিন্তার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে হবে, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস কখনোই জান্নাত (চরম সুখ) নয়, বরং শয়তানের ধোকাঁ। দুনিয়ায় যদি মানুষ সুখ পেতে চায়, তবে তাকে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার দ্বিনের প্রচার ও বাস্তবায়নের জন্য কঠোর ত্যাগ ও পরিশ্রম করতে হবে। ত্যাগেই সুখ- এটাই দুনিয়ার জান্নাত (মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য নিজের ইচ্ছা, সময় ও সম্পদ উৎসর্গ করার মধ্যে যে আত্মিক প্রশান্তি রয়েছে, তা দুনিয়ার অন্য কোনো ভোগ-বিলাসে নেই। মুমিনের জন্য এটাই দুনিয়ার জান্নাত বা হৃদয়ের স্থিরতা)। দুনিয়ার জান্নাতে কখনই মানুষ পরকালের জান্নাতের মতো যা চাইবে তা পাবে না (দুনিয়াতে মানুষ চাইলেই চিরযৌবন ধরে রাখতে পারে না, বৃদ্ধ/বৃদ্ধা অবস্থা থেকে আবার যুবক/যুবতী হওয়া এখানে অসম্ভব, মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে, মানুষ কখনই দুনিয়াতে একা বাঁচতে পারবেনা-অন্যের সাহায্য লাগবেই, প্রতিটি মানুষকে, দুনিয়ার দীর্ঘ জীবনে রোগে-শোকে কাতর হতেই হবে)। অন্যদিকে, পরকালের জান্নাতে সফল মুমিনেরা যা চাইবে, তৎক্ষণাৎ তা-ই পাবে। সেখানে কোনো রোগ নেই, শোক নেই, বার্ধক্য নেই, মৃত্যু নেই এবং কেউ কারো ওপর নির্ভরশীল হবে না (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২৫ : “আর হে নবি (সা.), যারা ইমান এনেছে এবং সৎকাজসমূহ করেছে, আপনি তাদেরকে এমন বেহেশতের সুসংবাদ দিন, যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবহমান থাকবে। যখনই তারা খাবার হিসেবে কোনো ফল প্রাপ্ত হবে, তখনই তারা বলবে, এত অবিকল সে ফলই, যা আমরা ইতঃপূর্বেও লাভ করেছিলাম। বস্তুত তাদেরকে একই প্রকৃতির ফল প্রদান করা হবে এবং সেখানে তাদের জন্য শুদ্ধাচারিণী রমণী কূল থাকবে। আর সেখানে তারা অনন্তকাল অবস্থান করবে”; সুরা আত তাওবাহ (০৯) আয়াত ৭২ : “আল্লাহ ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার নারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেনে কানন-কুঞ্জের, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় প্রস্রবণ। তারা সে গুলোরই মাঝে থাকবে। আর এসব কানন-কুঞ্জে থাকবে পরিচ্ছন্ন থাকার ঘর। বস্তুত এ সমুদয়ের মাঝে সবচেয়ে বড়ো হল আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটিই হলো মহান কৃতকার্যতা”; সুরা আল বাকারা (৩৬) আয়াত ৫৫, ৫৬, ৫৭, ৫৮ : “এদিন জান্নাতিরা আনন্দে মশগুল থাকবে। তারা এবং তাদের স্ত্রীরা উপবিষ্ট থাকবে ছায়াময় পরিবেশে আসনে হেলান দিয়ে। সেখানে তাদের জন্যে থাকবে ফল-মূল এবং যা চাইবে। করুণাময় পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাদেরকে বলা হবে সালাম”; সুরা মুহাম্মদ (৪৭) আয়াত ১৫ : “পরহেযগারদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে, তার অবস্থা নিম্নরূপ তাতে আছে পানির নহর, নির্মল দুধের নহর যারা স্বাদ অপরিবর্তনীয়, পানকারীদের জন্যে সুস্বাদু শরাবের নহর এবং পরিশোধিত মধুর নহর। তথায় তাদের জন্যে আছে রকমারি ফল-মূল ও তাদের পালনকর্তার ক্ষমা। পরহেযগাররা কি তাদের সমান, যারা জাহান্নামে অনন্তকাল থাকবে এবং যাদেরকে পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি অতঃপর তা তাদের নাড়িভূঁড়ি ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেবে?”; সুরা হামীম সেজদাহ (৪১) আয়াত ৩১, ৩২ : “ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্যে আছে তোমরা দাবি কর। এটা ক্ষমাশীল করুণাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন”)। তাই, আজ থেকে আমরা মুমিনেরা যেন শপথ নেই (সুরা আল আহকাফ (৪৬) আয়াত ১৩ : “নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না”), জীবন বাজি রেখে হলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার ন্যায়ের পথকেই আঁকড়িয়ে ধরব জান্নাত লাভের জন্য-যেটি মহাসাফল্য।

২১. মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ, তার প্রকাশ্য ও চিরশত্রু শয়তানের (জিন শয়তান ও মানুষ শয়তান) নিত্যনতুন ধোঁকায় পড়ে আজ পৃথিবীতে এক ভয়ংকর ফেতনা-ফ্যাসাদের খেলায় মেতে উঠেছে। অধিকাংশ মানুষ এই ফেতনা-ফ্যাসাদে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেওয়াকে মহাসাফল্য বলে মনে করছে। মুমিনেরাও এই ফেতনা-ফ্যাসাদের জয়জয়কারকে নীরবে মেনে নিয়েছে। মুমিনদের যুগের উপযোগী দৃশ্যমান কোনো শক্তিশালী কর্মচঞ্চলতা (যুগোপযোগী কিছু মৌলিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা যেমন : বস্তুবাদ ও ভোগবাদের প্রভাবমুক্ত তাওহিদের খাঁটি জ্ঞানে ফিরে আসার ব্যবস্থা; শুধু প্রথাগত শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না থেকে কুরআন-সুন্নত জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে মুসলিম যুবসমাজকে সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করার ব্যবস্থা; কাফের বা অন্য শক্তির চিন্তাধারাকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবিলা করার জন্য শক্তিশালী থিংক-ট্যাংক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যবস্থা; মুসলিম বিশ্বকে পরনির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনার জন্য নিজস্ব জাকাত ও ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শক্তিশালী সুদমুক্ত অর্থনৈতিক মডেল দাঁড় করানোর ব্যবস্থা; নিজস্ব উৎপাদন ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ব্যবস্থা, যাতে অন্য কোনো শক্তির কাছে জিম্মি হতে না হয়; ক্ষুদ্র দলগত বা উপদলীয় কোন্দল বাদ দিয়ে বৃহত্তর ইসলামি ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ব্যবস্থা; মুনাফিকদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং সাধারণ মানুষের হতাশা দূর করতে মুসলিমদের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা, যেন মানুষ ইসলামের বাস্তব সৌন্দর্য দেখতে পায়; শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানের গণমাধ্যম এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে ইসলামের সঠিক রূপ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা, এবং মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে হলে কেবল ক্ষোভ প্রকাশ না করে নবিজি (সা.)-এর মতো পরম ধৈর্য, দয়া এবং প্রজ্ঞার সাথে মানুষের কাছে দ্বিনের দাওয়াত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা) নেই যার মাধ্যমে মুসলিম সমাজ আবারও সেই নবি মুহাম্মদ (সা.) এর স্বর্ণযুগে ফিরে যেতে পারে এবং বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে- যেটি মানুষকে (মুমিনরা ইমান হারিয়ে ফেলছে, কাফেরেরা মুমিনেরকে কোণঠাসা করে নিজেদেরকে বিশ্ব নিয়ন্ত্রক মনে করছে অথচ মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালাই এই মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রক যিনি খুব শীঘ্রই পরকাল উন্মোচন করবেন (সুরা আম্বিয়া (২১) আয়াত ১০৪ : “সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেমন গুটানো হয় লিখিত কাগজপত্র। যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। আমার ওয়াদা নিশ্চিত, আমাকে তা পূর্ণ করতেই হবে”), মুনাফেকরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থেকে একবার মুমিনদের দিকে, তো আরেকবার কাফেরদের দিকে ঝুকেঁ পরছে) জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাবে। মুসলিম সমাজ আজ সুদ, অশ্লীলতা, হত্যা, পরচর্চা, পরনিন্দা, অন্তরের কপটতা, হিংসা, অহংকার, দুনিয়ার মোহ, এবং কাফের-মুশরিকদের বিশ্ব-ব্যবস্থায় নিজেকে যেভাবে বিকিয়ে দিচ্ছে, মুমিনদের জাহান্নামের ভয়াবহ আজাব থেকে রক্ষা পাওয়া খুবই কঠিন হবে (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২৪ : “আর যদি তা না পার-অবশ্য তা তোমরা কখনও পারবে না, তাহলে সে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা কর, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফেরদের জন্য”; সুরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ১৭৯ : “আর আমি সৃষ্টি করেছি দোজখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হলো গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ”; সুরা হিজর (১৫) আয়াত ৪৩, ৪৪ : “তাদের সবার নির্ধারিত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। এর সাতটি দরজা আছে। প্রত্যেক দরজার জন্যে এক একটি পৃথক দল আছে”; সুরা ক্বাফ (৫০) আয়াত ৩০ : “যেদিন আমি জাহান্নামকে জিজ্ঞাসা করব; তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ? সে বলবে আরও আছে কী?”; সুরা ইব্রাহীম (১৪ ) আয়াত ১৬, ১৭ : “তার পেছনে দোজখ রয়েছে। তাতে পুঁজ মেশানো পানি পান করানো হবে। ঢোক গিলে তা পান করবে এবং গলার ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না। প্রতি দিক থেকে তার কাছে মৃত্যু আগমন করবে এবং সে মরবে না। তার পশ্চাতেও রয়েছে কঠোর আজাব”; সুরা আন নাবা (৭৮) আয়াত ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০ : “নিশ্চয় জাহান্নাম প্রতীক্ষায় থাকবে, সীমালঙ্ঘনকারীদের আশ্রয়স্থলরূপে। তারা তথায় শতাব্দীর পর শতাব্দী অবস্থান করবে। তথায় তারা কোন শীতল এবং পানীয় আস্বাদন করবে না; কিন্তু ফুটন্ত পানি ও পুঁজ পাবে। পরিপূর্ণ প্রতিফল হিসেবে। নিশ্চয় তারা হিসাব-নিকাশ আশা করত না। এবং আমার আয়াতসমূহে পুরোপুরি মিথ্যারোপ করত। আমি সবকিছুই লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষিত করেছি। অতএব, তোমরা আস্বাদন কর, আমি কেবল তোমাদের শাস্তিই বৃদ্ধি করব”)। সুতরাং, আমরা মুমিনেরা যেন ভয়ংকর জাহান্নাম থেকে বাঁচতে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার দরবারে তওবা করে আজ থেকেই শপথ নিই মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার পথেই (দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো ও মনোযোগের সাথে আদায় করা, যা জীবনের শৃঙ্খলা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রাখে; আল্লাহর সমস্ত আদেশ (যেমন : হালাল উপার্জন, পর্দা, পিতা-মাতার সেবা) মেনে চলা এবং নিষেধসমূহ (যেমন : সুদ, ঘুস, মিথ্যা, গিবত) থেকে দূরে থাকা; আল্লাহর পথ সঠিকভাবে জানার জন্য প্রতিদিন অর্থসহ কুরআন এবং রসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বা হাদিস পড়া; সকাল-সন্ধ্যার জিকির, ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) এবং বেশি বেশি নফল ইবাদত করা, এবং এমন বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করা যারা আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সৎ কাজের উৎসাহ জোগায়) জীবন উৎসর্গ করার।

২২. পবিত্র কুরআনের প্রতিটি আয়াত হলো : বিশ্বজাহানের মালিক ও সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার কথা ও মানবজাতির জন্য এক মহা উপদেশ, ন্যায় ও অন্যায়কে বোঝার। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, মুমিনেরা আজ মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার এই মহামূল্যবান বিধান বা নির্দেশনাকে না মেনে তুচ্ছ মূল্যে খরিদ করছে নিজেদের দুনিয়াবি স্বার্থ, পদমর্যাদা বা কুপ্রবৃত্তির মনোবাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য। মুমিনেরা আজ চিরস্থায়ী আখিরাতের পরিবর্তে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি লাভকে বেছে নেওয়াকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে, নিজেরা তো পথভ্রষ্ট হচ্ছে, অন্যদেরকেও সত্যের পথে আসতে বাধা দিচ্ছে। মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার আয়াতসমূহকে স্বল্পমূল্যে বিনিময় করে যারা পবিত্র কুরআনের আলোর পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে, তা অতি নিকৃষ্ট ও জঘন্য কাজ। আজ আমরা এর খারাপ পরিণতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পাচ্ছি : মুমিনেরা ও তাদের সন্তানদের ইসলাম বিমুখতার আচরণের কারণে (ইবাদতে অলসতা ও অবহেলা, ফলে দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ত্যাগ করা, রমজানের রোজা না রাখা বা ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ ইবাদতগুলো এড়িয়ে যাওয়া; পাপাচারের প্রতি আকর্ষণের ফলে হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে সুদ, ঘুস, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি এবং অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া; দ্বিনি জ্ঞান অর্জনে অনীহা, ফলে পবিত্র কুরআন, হাদিস এবং ইসলামের মৌলিক নিয়মকানুন জানার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ না দেখানো; ইসলামিক রীতিনীতির প্রতি অবজ্ঞা, ফলে ইসলামের বিভিন্ন বিধান বা সুন্নাহকে আধুনিকতার পরিপন্থি বা প্রাচীনপন্থি বলে উপহাস করা; বস্তুবাদী মানসিকতা পোষণ, ফলে পরকালের জবাবদিহিতার কথা ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র দুনিয়াবি লাভ, ভোগবিলাস এবং সম্পদের পেছনে অন্ধের মতো ছোটা) (সুরা আত তাওবাহ (০৯) আয়াত ০৯ : “তারা আল্লাহর আয়াত সমূহ নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করে, অতঃপর লোকদের নিবৃত রাখে তাঁর পথ থেকে, তারা যা করে চলছে, তা অতি নিকৃষ্ট”; সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ৪১ : “আর তোমরা সে গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, যা আমি অবতীর্ণ করেছি সত্য বক্তা হিসেবে তোমাদের কাছে। বস্তুত তোমরা তার প্রাথমিক অস্বীকারকারী হয়ো না, আর আমার আয়াতের অল্প মূল্য দিও না এবং আমার (আজাব) থেকে বাঁচ”; সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ১৭৪ : “নিশ্চয় যারা সেসব বিষয় গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাজিল করেছেন এবং সেজন্য অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা আগুন ছাড়া নিজের পেটে আর কিছুই ঢুকায় না। আর আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সাথে না কথা বলবেন, না তাদের পবিত্র করা হবে, বস্তুত তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব”)। তাই, আজ থেকে মুমিনদেরকে শপথ নিতে হবে, মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার আয়াতগুলো হলো : আমাদের জীবনের জন্য মহামূল্যবান উপদেশ, যার প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে সফল হতে পারবো (পবিত্র কুরআনের বিধান এবং উপদেশগুলো শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়, বরং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মাধ্যমেই দুনিয়াতে শান্তি এবং আখেরাতে মুক্তি (নাজাত) লাভ করা সম্ভব, তাই প্রতিদিন অন্তত দু-একটি আয়াত অর্থ ও তাফসীরসহ পড়ার অভ্যাস করা, আয়াতের অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা যে, এটি আমার ব্যক্তিগত জীবনে কী বার্তা দিচ্ছে, এবং যা শিখছি, তা ছোট আকারে হলেও সাথে সাথে নিজের আচরণ, লেনদেন বা ইবাদতে প্রয়োগ করা) (সুরা আল ইমরান (০৩) আয়াত ১৯৯ : “আর আহলে কিতাবদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর উপর ইমান আনে এবং যা কিছু তোমার উপর অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে, সেগুলোর উপর, আল্লাহর সামনে বিনয়াবনত থাকে এবং আল্লাহর আয়াতসমুহকে স্বল্পমূল্যের বিনিময়ে সওদা করে না, তারাই হলো : সে লোক, যাদের জন্য পারিশ্রমিক রয়েছে, তাদের পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয়ই আল্লাহ যথাশীঘ্র হিসাব চুকিয়ে দেন”)।

২৩. আজকের দুনিয়ার এই মুসলিম সমাজ এক ভয়াবহ নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। মুমিনেরা প্রকৃত ইমান-আকিদা রক্ষার কথা ভুলেই গেছে। ফলে, মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে বাহ্যিক ইবাদত ও নৈতিক আচরণের মধ্যে একটি স্পষ্ট দূরত্ব দেখা যাচ্ছে। একদিকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা বা জাকাত আদায়ের মতো ফরজ ইবাদতগুলো পালিত হচ্ছে, অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনে সুদ, ঘুস, নেশা, উত্তরাধিকার সম্পদ আত্মসাৎ, অন্যের হক নষ্ট করা এবং আমানতের খেয়ানতের মতো মারাত্মক গুনাহের কাজও অবাধে চলছে। মুমিনদের এই দ্বিচারিতার জন্য তাদেরকে কাফের ও অস্বীকারকারীদের মতই পরকালে চরম অনুশোচনা করতে দেখা যাবে। যখন তাদেরকে দোজখের (জাহান্নামের) সামনে দাঁড় করানো হবে, তখন তারা বুঝতে পারবে তাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ। বাঁচার কোনো উপায় না দেখে তারা (কাফের ও অস্বীকারকারী, দ্বিচারিতায় আসক্ত মুমিন) আকুতি জানিয়ে বলবে— যদি তাদেরকে দুনিয়ায় আবার ফেরত পাঠানো হয়, তবে তারা আর মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার নিদর্শন অস্বীকার করবে না এবং প্রকৃত মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু সর্বজ্ঞানী আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা তার বান্দার অন্তরের উপলব্ধি জানেন যে, তাদের এই কথাটি আন্তরিক নয়। তারা শুধু শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য মিথ্যা বলছে। আর যদি তাদেরকে সত্যিই আবার দুনিয়ায় পাঠানো হয়, তবে তারা আবার আগের মতোই নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হবে, কারণ নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী (সুরা আল আনআম (০৬) আয়াত ২৭, ২৮ : “আর আপনি যদি দেখেন, যখন তাদেরকে দোজখের উপর দাঁড় করানো হবে! তারা বলবে কতই না ভালো হত, যদি আমরা পুনঃ প্রেরিত হতাম, তাহলে আমরা স্বীয় পালনকর্তার নিদর্শনসমূহে মিথ্যারোপ করতাম না এবং আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম। এবং তারা ইতি পূর্বে যা গোপন করত, তা তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। যদি তারা পুনঃপ্রেরিত হয়, তবুও তাই করবে, যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী”; সুরা সেজদাহ (৩২) আয়াত ১২ : “যদি আপনি দেখতেন, যখন অপরাধীরা তাদের পালনকর্তার সামনে নতশির হয়ে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা দেখলাম ও শ্রবণ করলাম। এখন আমাদেরকে পাঠিয়ে দিন, আমরা সৎকর্ম করব। আমরা দৃঢ়বিশ্বাসী হয়ে গেছি”; সুরা আল মুমিনূন (২৩) আয়াত ৯৯, ১০০ : “যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে হে আমার পালনকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে ) প্রেরণ করুন। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। কখনই নয়, এ তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত”)। সেজন্য, মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে, ইসলাম কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, যেখানে মানুষের অধিকার এবং নৈতিক চরিত্রকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই, মুমিনদেরকে গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করতে হবে : ইসলামে পূর্ণাঙ্গতার অভাব কী? (অনেকেই মনে করেন, শুধু নামাজ-রোজা করলেই ইসলাম পালন হয়ে যায়। অথচ ইসলামে লেনদেন এবং চরিত্র সমান গুরুত্বপূর্ণ); ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য অনুধাবন না করা কী? (নামাজ মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখার কথা। কিন্তু নামাজ যদি জীবনে পরিবর্তন না আনে, তবে বুঝতে হবে সেই ইবাদতে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে); পরকালের জবাবদিহিতার ভয় কমে যাওয়া কী? (সুদ, ঘুস এবং উত্তরাধিকারের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার মূল কারণ হলো : অতিরিক্ত দুনিয়া প্রীতি এবং আখেরাতের জবাবদিহিতার চেতনা হারিয়ে ফেলা। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শেষ জমানায় মানুষ হালাল-হারামের পরোয়া করবে না); আমানতের খেয়ানত ও মোনাফেকি লক্ষণ কী? (ইসলামে আমানতের খেয়ানত করাকে মোনাফেকির লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো সমাজে যখন আমানতদারিতা উঠে যায়, তখন সেখানে সামাজিক ও ধর্মীয় বিপর্যয় নেমে আসে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় : কেবল ইবাদতের নিয়ম জানলেই হবে না, কোনটি হালাল আর কোনটি হারাম— সেই জ্ঞান অর্জন করাও প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ; অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করা, যাতে জনসম্মুখে বা গোপনে— সব অবস্থায় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়; মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করা বা উত্তরাধিকার ঠকানোর গুনাহ আল্লাহ ততক্ষণ মাফ করবেন না, যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি নিজে মাফ করে। এই বিষয়ে সমাজকে সচেতন করা)।

পরিশেষে, পবিত্র কুরআন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জ্ঞানগর্ভ কথা। পবিত্র কুরআনে ৬,৬৬৬ টি আয়াত রয়েছে। আমাদের মুমিনদেরকে এই সবগুলো আয়াতই পড়তে এবং উপলব্ধি করতে হবে, যাতে আমরা চিন্তাশীল হয়ে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার হক, মানুষের হক, এবং শয়তানের ধোঁকা বুঝতে পারি।

Find Articles, Fatwas, And Knowledge

Search by topic, keyword, or category and press enter.