Human’s Right

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হকের পাশাপাশি বান্দার বা মানুষের হক আদায়ে রয়েছে কঠোর নির্দেশনা। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আল্লাহ সুবাহানাতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানুষ : যাকে সুন্দর গঠন ও অবয়ব (সুরা ত্বীন (৯৫) আয়াত ৪ : “আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতর অবয়বে”), অসীম বুদ্ধিমত্তা (সুরা আলাক (৯৬) আয়াত ৪, ৫ : “যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না”), পরিশ্রমী (সুরা আল বালাদ (৯০) আয়াত ৪ : “নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি”), এবং একইসাথে অতীব দুর্বল (সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ২৮ : “আল্লাহ তোমাদের বোঝা হালকা করতে চান। মানুষ দুর্বল সৃজিত হয়েছে”) করে সৃষ্টি করা হয়েছে পরীক্ষা করার জন্য কে কাজে উওম (সুরা মূলক (৬৭) আয়াত ২ : “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল”)। শিশু থেকে শুরু হয়ে বৃদ্ধ পর্যন্ত মানুষের সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। কিন্তু মানুষ কি সত্যিই এই বিশ্বে তার প্রাপ্য হক পাচ্ছে? পবিত্র কুরআন, যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মালিক, আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার কথা : সুষম সমাজ গঠনের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, পবিত্রতা, মানহানি, সম্মান, ব্যক্তিগত মালিকানা, উত্তরাধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার, সমতা এবং সুবিচার নিশ্চিত করেছে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত অন্যতম মানুষের হকগুলো, যা আমাদের (মুমিন মুসলিমদের) জন্য অবশ্যই পালনীয়, তা বর্ণনা করা হলো :

১. মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা আমাদের (মানুষের) স্রষ্টা। তিনি প্রতিটি শিশুকে তাদের বাবা ও মায়ের মাধ্যমে এই পৃথিবীতে আনয়ন করেন। প্রতিটি শিশুর মাতা অসীম কষ্ট স্বীকার করে সন্তান প্রসব করেন (সুরা লোকমান (৩১) আয়াত ১৪ : “আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্‌ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে”)। এরপর রাত-দিন সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে একটি শিশুকে পরম যত্নে বাবা-মা বড়ো করে তোলেন। বাবা-মায়ের এই ঋণ সন্তানের পক্ষে কোনোভাবেই এই পৃথিবীতে মেটানো সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি সন্তান যেন কৈশোর বয়স থেকে বাবা-মাকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করে, যাতে বাবা-মা কিছুটা স্বস্তি পান। তবে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক পালনে যদি বাবা-মা সন্তানকে বাধা দেন, সেক্ষেত্রে সন্তান বিনয়ের সাথে বাবা-মাকে মোকাবিলা করবে : মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালাই আমাদের সবার সৃষ্টিকর্তা এবং রিজিকদাতা। এক্ষেত্রে যদি কোনো অমুসলিম পরিবারে সন্তান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়ে মুসলিম হন, তবে অবশ্যই তিনি তার বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করবেন এবং একইসাথে তাদের দেখাশোনা চালিয়ে যাবেন (সুরা লোকমান (৩১) আয়াত ১৫ : “পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরিক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহাবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জ্ঞাত করবো”)। অতএব, সন্তান কখনোই বাবা-মাকে কষ্ট দেবে না এবং তাদের বৃদ্ধ বয়সে নিবিড়ভাবে দেখাশোনা করবে, এটাই বান্দার অন্যতম হক (সুরা বনি ইসরাঈলের (১৭) আয়াত ২৩, ২৪ : “তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতামাতার প্রতি সদয় ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবনে বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছায়, তাদের সাথে অবজ্ঞাপূর্ণ কথা বলো না, তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলো এবং, দয়ার বশবর্তী হয়ে, তাদের প্রতি বিনয়ের ডানা অবনত করো এবং বলো : "হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি তোমার রহমত দান করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছিল”)।

২. প্রতিটি শিশু এই পৃথিবীতে তাদের বাবা ও মা দ্বারা সৃষ্ট পরিবারে আগমন করে ও বেড়ে উঠে। এক সময় পরিবারের শিশুরা বড়ো হয়ে উঠে এবং বিয়ে করে নতুন পরিবার গঠন করে। পরিবারের ছেলেটি বিয়ে করে অন্য পরিবারের একটি মেয়ে নিয়ে আসে, অন্যদিকে পরিবারের মেয়েটি বিয়ে করে অন্য পরিবারে সংসার শুরু করে। আবার ছেলে-মেয়ে বিয়ে দিয়ে বাবা ও মা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হয়ে উঠেন। অর্থাৎ, একটি পরিবার থেকে অনেকগুলো পরিবারের সৃষ্টি হয়, যা মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার এক বিস্ময়কর নিয়ামত। প্রথম পরিবার হলো : বাবা ও মায়ের, এবং তা থেকে সৃষ্ট পরিবারগুলো হলো : ছেলে ও মেয়ের পরিবার। প্রত্যেকটি পরিবারের আয়-রোজগার রয়েছে এবং আয়-রোজগারের দ্বারা সৃষ্ট সম্পদও রয়েছে। বাবা-মা ও ছেলে-মেয়ে প্রত্যেকটি পরিবারের সম্পদের উপর একে-অপরের অধিকার রয়েছে। এই অধিকারের উপর ভিত্তি করে সর্বশক্তিমান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা উত্তরাধিকার সম্পদের অধিকারের উপর আদেশ দিয়েছেন, যা মুমিনদের অবশ্যই পালনীয় (সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ১১ : “আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের (সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রাপ্তি) সম্পর্কে বিধান দিচ্ছেন : এক ছেলে পাবে দুই মেয়ের অংশের সমান, শুধু মেয়ে দুই-এর বেশি রেখে গেলে তারা পাবে রেখে যাওয়া সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ, আর যদি এক মেয়ে থাকে, তবে সে পাবে অর্ধেক। তার সন্তান থাকলে তার পিতামাতা প্রত্যেকেই সম্পদের এক ষষ্ঠাংশ, সে নিঃসন্তান হলে যদি শুধু পিতামাতা তার উত্তরাধিকারী হয় তবে মা পাবে একতৃতীয়াংশ, কিন্তু যদি তার ভাইয়েরা থাকে, তবে তার মা পাবে এক ষষ্ঠাংশ; অবশ্য এ সবই হবে মৃত ব্যক্তির অসিয়তের দাবি পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতামাতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারের দিক থেকে কে তোমাদের বেশি আপন, তা তোমরা জানো না। এই হচ্ছে আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়"; সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ১২ : "তোমাদের স্ত্রীদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির অর্ধেক তোমাদের জন্যে, যদি তারা নিঃসন্তান হয়। তাদের সন্তান থাকলে রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ তোমরা পাবে, অসিয়ত পালন ও ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের সন্তান না থাকলে স্ত্রীরা পাবে রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ, যদি একটি সন্তান থাকে তবে রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক অষ্টমাংশ স্ত্রীরা পাবে, তোমাদের অসিয়ত পালন ও ঋণ পরিশোধের পর। আর যদি কোনো পুরুষ বা মহিলা নিঃসন্তান হয় এবং মা-বাবাও মারা গিয়ে থাকে কিন্তু এক ভাই বা বোন জীবিত থাকে তবে তারা প্রত্যেকে পাবে এক ষষ্ঠাংশ, আর যদি তারা সংখ্যায় বেশি হয় তবে তারা এক তৃতীয়াংশ পাবে, তবে সবটাই হবে অসিয়ত পালন ও ঋণ পরিশোধের পর— কারো অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। এই হচ্ছে আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, পরমসহনশীল”)। পারিবারিক শান্তি, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং পরকালীন মুক্তির জন্য মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা দেওয়া উত্তরাধিকার আইন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা প্রতিটি মুমিন পরিবারের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। তাই, যে-সব পরিবারের মুমিনেরা সঠিকভাবে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টন করবে, মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা তাদেরকে নিয়ামতের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যেখানে তারা চিরকাল থাকবে এক অনন্ত সুখ ও আনন্দের মধ্যে- যেটি হলো মুমিনদের জন্য মহা সাফল্য (সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ১৩ : “(উত্তরাধিকারের ব্যাপারে) এই হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে থাকবে প্রবহমান ঝর্ণাধারা। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। প্রকৃতপক্ষে এটাই আসল সাফল্য”) অন্যদিকে, যে-সব মুমিনেরা (যারা অন্যের, বিশেষ করে নিজের ভাই বা বোনের হকের সম্পদ জোরপূর্বক বা কৌশলে আত্মসাৎ করে মনে করছে জিতে গেছি) অবাধ্য হয়ে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা উত্তরাধিকার আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের কঠিন ও অপমানজনক শাস্তি, যেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে- যেটি হলো মুমিনদের জন্য মহা দুর্ভাগ্য (সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ১৪ : “অপরদিকে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসুলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর বিধান লঙ্ঘন করবে, তিনি তাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করবেন। সেখানে সে জ্বলবে চিরকাল। তার জন্যে অপেক্ষা করছে অপমানকর শাস্তি”; সহিহ বুখারি হাদিস নং ২২৯১ : “কেউ যদি অন্যায়ভাবে কারো এক বিঘত জমিও দখল করে, তবে কেয়ামতের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় বেড়ি বানিয়ে পরিয়ে দেওয়া হবে”)।

৩. শয়তানের ধোঁকায় পড়ে, জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়ে মানুষের আদি পিতা-মাতা পৃথিবীতে আগমন করেন। মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার দয়ায়, কঠোর পরিশ্রম ও ক্ষমায় তারা আবার জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হন এবং রেখে যান তাদের বংশধরদের। কেয়ামত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে মানুষের আগমন ঘটবে, কারণ কোটি কোটি বছর আগে সৃষ্ট মানুষের আত্মাগুলো মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার কাছে এই স্বীকারোক্তি দিয়েছিল যে, তিনিই মানুষের একমাত্র রব। এই অঙ্গীকার নেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল এই আত্মাগুলো মানুষ হিসাবে দুনিয়ার কঠিন পরীক্ষার পর যাতে কেয়ামতের দিন এই ওজর বা অজুহাত দেখাতে না পারে যে, তারা তাদের সৃষ্টিকর্তা ও রব সম্পর্কে অসচেতন ছিল বা জানত না (সুরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ১৭২ : “হে নবি! সবাইকে স্মরণ করিয়ে দাও, তোমার প্রতিপালক যখন আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তার বংশধরদের বের করেন এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই?’ তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি!’ এ ব্যবস্থা এজন্যে করা হয়েছে, যাতে তোমরা মহাবিচার দিবসে না বলতে পারো যে, আমরা তো এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না”)। আজকের এই পৃথিবীতে চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়া মানুষের দৈনিক সংগ্রাম, ক্ষুধা, বাসস্থানহীনতা এবং চিকিৎসার অভাব সত্যিই এক অবর্ণনীয় কষ্টের রূপ। এটি পৃথিবীর বুকে এক চরম মানবিক সংকট। অথচ, পবিত্র কুরআনে সমাজ ও পরিবারের দুর্বল, এতিম ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ধনীদের উপার্জিত সম্পদে অভাবী ও বঞ্চিতদের সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে (সুরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ১৭২ : “এবং তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক ছিল”)। এতিমদের প্রতি রূঢ় আচরণ করা এবং অসহায়দের খাবার না দেওয়াকে ইসলামে অত্যন্ত বড়ো অপরাধ এবং দ্বীন বা ধর্মকে অস্বীকার করার শামিল বলা হয়েছে (সুরা মাউন (১০৭) আয়াত ১, ২, ৩ : “(হে নবি) তুমি কি কখনো চিন্তা করেছ, কোন ধরনের লোকেরা কর্মফল দিবসকে অস্বীকার করে? এ ধরনের লোকেরা এতিমের সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করে, অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে কোনো আগ্রহ বোধ করে না বা অন্যকেও উৎসাহিত করে না”)। তাই, সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা জাকাতকে ফরজ (বাধ্যতামূলক) করেছেন। জাকাত কোনো দয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের বা সমাজের বিত্তশালীদের থেকে সংগ্রহ করে অভাবী, ঋণগ্রস্ত এবং বাসস্থানহীন মানুষের মধ্যে বণ্টন করার একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এছাড়া অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তার জন্য সদকা ও কোরবানির মতো বিধান রাখা হয়েছে। সুতরাং, আমরা মুমিনেরা যেন জাকাত ও সদকায় অংশগ্রহণ করে গরীব ও অসহায় মানুষের হক পালনের মাধ্যমে তাদেরকে স্বাবলম্বী করতে উৎসাহিত হই এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাধ্য করি যেন তারা জাকাত ও সদকা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা  করে।

৪. রিজিকদাতা আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা কোন ব্যবসা বা দরকারী কাজে জরুরী অর্থের প্রয়োজন ব্যক্তিকে কর্জে হাসানা (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পূর্ণ সুদ ও অতিরিক্ত চার্জ ছাড়া কাউকে বিনা শর্তে ঋণ বা ধার দেওয়ার একটি মানবিক ও ইসলামিক নিয়ম) দেয়ার আদেশ করেছেন (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২৪৫ : “তোমাদের মধ্যে কে আল্লাহকে ‘কর্জে হাসানা’ (অর্থাৎ উত্তম ঋণ) দেবে? আল্লাহ বহুগুণ প্রবৃদ্ধিসহ তা ফেরত দেবেন। আল্লাহই মানুষের রিজিক বা জীবনোপকরণ কমান এবং বাড়ান। তোমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে”; সুরা আল হাদীদ (৫৭) আয়াত ১১, ১২ : “তোমরা কে আছ, যে আল্লাহকে কর্জে হাসানা বা উত্তম ঋণ দেবে? (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে মানবকল্যাণে করা প্রতিটি কাজকেই আল্লাহ উত্তম ঋণের মর্যাদা দিয়েছেন) তিনি এ ঋণ তাকে বহুগুণে ফিরিয়ে দেবেন। আর তাছাড়া তারা মহাপুরস্কারে ভূষিত হবে সেদিন, যেদিন তুমি দেখবে বিশ্বাসী নরনারীদের সামনে ও ডানে জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তাদের বলা হবে, ‘আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার পাদদেশে থাকবে প্রবহমান ঝর্নাধারা—তোমাদের স্থায়ী আবাস। এটাই মহাসাফল্য”; সুরা আত তাগাবুন (৫৭) আয়াত ১৭, ১৮ : “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও (সৃষ্টির সেবায় ব্যয় করো)। তিনি এর বহুগুণ প্রতিদান দেবেন আর তোমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতিগুণগ্রাহী, পরমসহনশীল। তিনি দৃশ্যমান ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”) । ইসলামে কর্জে হাসানা (সুদবিহীন উত্তম ঋণ) দেওয়াকে একটি অত্যন্ত সওয়াব ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে মুমিনদের উদ্দেশ্যে কর্জে হাসানা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে দুনিয়া ও আখিরাতে বহুগুণ প্রতিদান দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজে কোনো ঋণের মুখাপেক্ষী নন। কিন্তু কোনো অভাবী, ব্যবসায়ী বা জরুরি প্রয়োজনে আটকে পড়া মানুষকে সাহায্য করার অর্থ হলো দয়ালু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করা। তাই রিজিকদাতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা একে নিজের সাথে লেনদেন বা নিজেকে ঋণ দেওয়ার মতো সম্মানিত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এর জন্য গুনাহ মাফ ও রিজিকে বরকতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কর্জে হাসানা অভাবী, জরুরি প্রয়োজনে আটকে পড়া মানুষদের হক, তাই আমরা মুমিনেরা যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্জে হাসানায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাধ্য করি যেন তারা কর্জে হাসানা কার্যকলাপ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করে।

৫. মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা আমাদেরকে বিনা কারণে ও মামুলি ঘটনায় মানুষ হত্যা নিষেধ করেছেন (সুরা আল মায়েদাহ (০৫) আয়াত ৩২ : “এ কারণেই আমি বনী-ইসরাঈলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে, সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। তাদের কাছে আমার পয়গম্বরগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলি নিয়ে এসেছেন। বস্তুত এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমাতিক্রম করে”; সুরা আল আনআম (০৬) আয়াত ১৫১ : “আপনি বলুন, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শোনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তা এই যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না, পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের কারণে হত্যা করো না, আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দেই, নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য; যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বুঝ” )। অথচ সমাজে মানুষ হত্যা ঘটেই চলেছে। চিন্তাশীল ও বিবেকবান মানুষ (মুমিন মুসলিম) কখনই মানুষ হত্যা করতে পারে না। তাই আমাদেরকে (চিন্তাশীল ও বিবেকবান মুমিন মুসলিমরা), ‘মানুষ কেন অন্য মানুষকে হত্যা করে’ এর কারণ বের করে সমাজ থেকে হত্যা নির্মূল করার মাধ্যমে বান্দার হক আদায় করতে হবে। মানুষ হত্যার পেছনে সাধারণত মনস্তাত্ত্বিক (চরম মানসিক অসুস্থতা, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, তাৎক্ষণিক তীব্র ক্ষোভ, নেশার ঘোর), সামাজিক (পারিবারিক কলহ, শৈশবের ভয়াবহ নিপীড়ন, দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্য ও হতাশা, পরকীয়া বা সম্মান রক্ষার নামে), এবং অর্থনৈতিক (অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ, অর্থ আত্মসাৎ, আধিপত্য বিস্তার, চরম দারিদ্র্য, মাদকের অর্থ জোগাড়) কারণগুলো কাজ করে। মনস্তাত্ত্বিক হত্যার ক্ষেত্রে মানুষের মস্তিষ্কের যৌক্তিক অংশ কাজ করেনা, ফলে হত্যাকারীর স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি লোপ পায় এবং চরম সহিংস আচরণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটায়। অন্যদিকে, সামাজিক হত্যার ক্ষেত্রে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের অভাব, ইণ্টারনেটের অপব্যবহার, মৌলিক মানবীয় গুণাবলির অনুপস্থিতি, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলা এবং নৈতিকতাহীন শিক্ষা মানুষকে মানসিকভাবে দিশেহারা করে ফেলে যা তাকে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর রসদ জোগায়। অর্থনৈতিক হত্যার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্যেই মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে ফেলে, পরিণতিতে অর্থের লোভে পড়ে মানুষ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তাই সমাজে মানুষ হত্যা বন্ধ করতে হলে মুমিনদেরকে (বিভিন্ন পেশায় কর্মরত) অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মনস্তাত্ত্বিক হত্যা রোধ করতে, ইসলামি শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের জ্ঞান সমাজের প্রতিটি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার সাথে সাথে তাদের প্রতিক্রিয়া ও উপলব্ধি মূল্যায়ন করতে হবে। সামাজিক হত্যা রোধ করতে, ইসলামি শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধের জ্ঞান সমাজের প্রতিটি পরিবারের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার সাথে সাথে তাদের প্রতিক্রিয়া ও উপলব্ধি মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থনৈতিক হত্যা রোধ করতে ইসলামি অর্থনৈতিক কার্যক্রম (জাকাত, সদকা, কর্জে হাসানা, হাদিয়া) খুব নিবিড় ও যত্নসহকারে কার্যক্রম চালাতে হবে যাতে প্রকৃত অভাবী ব্যক্তি, পরিবার, ও প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক সাহায্য পায়।

৬. সর্বজ্ঞানী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষকে সৃষ্টির সেরা হিসেবে সৃষ্টি করে, তাকে ভালো এবং মন্দ কাজের ক্ষমতা দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন পরীক্ষা করার জন্য কে কাজে উত্তম। তিনি মানুষকে বিবেক, বুদ্ধি এবং স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন বোঝার জন্য কোনটি ন্যায় ও কোনটি অন্যায় কাজ। বিবেক ও বুদ্ধি দিয়ে মানুষ অনায়াসে তার ভেতরের ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করতে পারে। মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে চাইলে ভালো কাজ করতে পারে, আবার মন্দ কাজও করতে পারে। ফেরেশতাদের মতো মানুষ কেবল আদেশ পালনে বাধ্য নয়, বরং নিজের ইচ্ছায় প্রজ্ঞাময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ইবাদত করার স্বাধীনতা তাদের দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া, বিবেক-বুদ্ধির পাশাপাশি মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যুগে যুগে নবি-রাসূল এবং আসমানি কিতাব পাঠিয়েছেন, যাতে মানুষ কোনো দ্বিধায় না পড়ে। ইসলামি আকীদা অনুযায়ী, পবিত্র কুরআন হলো চিরঞ্জীব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত সর্বশেষ, চূড়ান্ত এবং অবিকৃত আসমানি কিতাব। এর সুরক্ষার দায়িত্ব স্বয়ং মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিয়েছেন, যার ফলে চৌদ্দশত বছরেরও বেশি সময় ধরে এর একটি অক্ষরও পরিবর্তিত হয়নি। এটি কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য একমাত্র হেদায়েত বা সঠিক পথের দিশারি। তাই, মুমিনদেরকে মানুষের সাথে ভালো ও সুন্দর আচরণ করতে হবে, তাদেরকে গালি ও উপহাস (সুরা আল হুজরাত (৪৯) আয়াত ১১ : “হে বিশ্বাসীগণ! কোনো পুরুষ যেন অন্য কোনো পুরুষকে উপহাস বা বিদ্রুপ না করে, কারণ উপহাসকারীর চেয়ে সে ভালো হতে পারে এবং কোনো নারী যেন অন্য কোনো নারীকে উপহাস বা বিদ্রুপ না করে, কারণ উপহাসকারিণীর চেয়ে সে ভালো হতে পারে। (সাবধান) তোমরা একে অপরের বদনাম কোরো না। মন্দনামে ডেকো না। মন্দনামে ডেকে একে অন্যকে অপমান কোরো না। বিশ্বাস স্থাপন করার পর মন্দনামে ডাকা অতিগর্হিত কাজ। (এ ধরনের গর্হিত কাজ করার পর) যদি তওবা না করে, তবে তারা নিঃসন্দেহে সীমালঙ্ঘনকারী, জালেম”), পরনিন্দা ও অপবাদ (সুরা আল হুজরাত (৪৯) আয়াত ১২ : “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সাধারণভাবে অন্যের ব্যাপারে আন্দাজ-অনুমান করা থেকে বিরত থাকো। আন্দাজ-অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুনাহের কাজ। অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি কোরো না। কারো অনুপস্থিতিতে গিবত অর্থাৎ পরনিন্দা কোরো না। তোমরা কি মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে চাও? না, তোমরা তো তা ঘৃণা করো (গিবত করা মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সমান)। তোমরা সবসময় আল্লাহ-সচেতন থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু”) করা যাবে না, কারণ প্রতিটি মানুষের মান-সম্মান রক্ষা করা বান্দার হকের অন্তর্ভুক্ত। রসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম ও মুমিনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জবান (জিহ্বা) ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে এবং প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যার ওপর মানুষ তাদের জান ও মালের বিষয়ে আস্থা রাখতে পারে” (জামে আত-তিরমিজি হাদিস নং : ২৬২৭)। অতএব, একজন প্রকৃত মুমিন হতে হলে শুধু ইবাদত করাই যথেষ্ট নয়, বরং কথাবার্তা ও আচরণের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি মানুষের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

৭. যৌতুক একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি, যা কনের পরিবারের ওপর বিশাল এক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে এবং সমাজে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক কলহ বাড়িয়ে দেয়। যৌতুক হলো বিয়ের শর্ত হিসেবে বা বিয়ের সময় বর বা তার পরিবার কর্তৃক কনের পরিবারের কাছে দাবি করা বা গ্রহণ করা সম্পদ। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি হারাম ও অনৈসলামিক প্রথা। ইসলামে বরং বরপক্ষ কর্তৃক কনেকে মোহরানা (অর্থ বা সম্পদ) প্রদান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিয়ের মাধ্যমেই পরিবার গঠন হয় এবং এটি হলো : মানব সমাজের আদি এবং সবচেয়ে পবিত্র ভিত্তি, যার সূচনা স্বয়ং মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নির্দেশে জান্নাতে হয়েছিল। হজরত আদম (আঃ) এবং হজরত হাওয়া (আঃ)-এর পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পৃথিবীতে মানব বংশবৃদ্ধি এবং একটি সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থার পথ উন্মোচন করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই সম্পর্কের গভীরতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি মানুষের মধ্য থেকেই তাদের স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা পারস্পরিক শান্তি, ভালোবাসা ও দয়া লাভ করতে পারে। ইসলামে বিয়ে কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি ইবাদত এবং পবিত্র বন্ধন, যা দুটি ভিন্ন জীবনের মাঝে সুন্দর সমন্বয় ঘটায় (সুরা রুম (৩০) আয়াত ২০, ২১ : “তাঁর মহিমার একটি নিদর্শন হচ্ছে, তিনি তোমাদের মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন। তারপর মানুষরূপে তোমরা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছ। তাঁর মহিমার আরেকটি নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্যে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও। তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক মমতা ও সমমর্মিতা সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীলদের জন্যে এর মধ্যে শিক্ষণীয় নিদর্শন রয়েছে”)। অথচ আমাদের মুমিনদের মধ্যেই রয়েছে যৌতুকলোভী বরপক্ষের নরপিশাচ/নারী পিশাচিনী। একটি পবিত্র পরিবার গঠনে তারা অভিশাপ। অন্যদিকে, মোহরানা নির্ধারণে অনেক সময় কনেপক্ষ বরের আর্থিক ক্ষমতার সীমার বাহিরে দাবি করেন, সেটাও ঠিক নয়। তাই, মুমিনদের মনে রাখতে হবে, পরিবার হলো : মানুষের মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তির সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন কোনো বান্দা বিয়ে করে, তখন সে তার অর্ধেক দ্বীন বা ইমান পূর্ণ করে। বিয়ে কেবল অধিকার আদায়ের জায়গা নয়, বরং একে অপরের প্রতি দয়া, ক্ষমা এবং ত্যাগের মাধ্যমে একটি জান্নাতী পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যম। সুতরাং, মুমিনদেরকে বিয়ে সম্পর্কিত মানুষের হক পালন করতে হলে : বিয়েকে সহজ এবং কম খরচে সম্পন্ন করতে হবে এবং মোহরানা এমন হওয়া উচিত যা বর আনন্দের সাথে এবং সহজে আদায় করতে পারে।

৮. মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার সৃষ্টির সেরা : পুরুষ এবং নারী মানুষ সৃষ্টি করছেন এই জন্য যে, কে খাস দিলে তার ইবাদত করে দুনিয়ার এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পরকালের মহাসাফল্য জান্নাত লাভ করতে পারবে। সৃষ্টির সেরা এই পুরুষ এবং নারীর শারীরিক গঠন এক নয়, তাই তাদের শরীরকে আবৃত করার অংশ ও পোষাক-পরিচ্ছেদ ভিন্ন। পুরুষদের সাধারণত নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত বা শরীরের মূল অংশ ঢেকে রাখার উপযোগী সাধারণ পোশাক নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে, নারীদের শারীরিক বিশেষত্বের কারণে তাদের জন্য আরও বেশি শরীর আবৃতকারী ও ঢিলেঢালা পোশাকের প্রচলন রয়েছে। ইসলামে পুরুষ ও নারীর পোষাক পরিধানের উপর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আরবিতে একে হিজাব যার অর্থ “পর্দা” বলা হয়। পুরুষদের ন্যূনতম শরীর ঢেকে রাখার হিজাব হচ্ছে ঢিলেঢালা পোষাক নাভি থেকে হাঁটুর নীচ পর্যন্ত : তবে পুরুষদের বিনা প্রয়োজনে খালি গায়ে বা অর্ধনগ্ন অবস্থায় বাইরে চলাফেরা করা শরিয়তে অপছন্দনীয়। নারীদের হিজাব হচ্ছে ঢিলেঢালা পোষাক যা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা থাকবে, শুধু মুখমণ্ডল ও হাতের কবজি ছাড়া : তবে নারীদের শরীরের সৌন্দর্য বা শারীরিক গঠন প্রকাশ যাতে না পায় (সুরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ২৬ : “হে আদমসন্তান! আমি তোমাদের লজ্জা নিবারণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যে পোশাক-পরিচ্ছদ (তৈরির জ্ঞান) দিয়েছি। তবে আল্লাহ-সচেতনতার পোশাকই সবচেয়ে ভালো পোশাক। এর মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর নিগূঢ় নিদর্শন, যাতে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে”; সুরা আন-নূর (২৪) আয়াত ৩১ : “(হে নবি!) বিশ্বাসী নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে শালীন রাখে, লজ্জাস্থানসমূহ ঢেকে চলে এবং যৌনাকাঙ্ক্ষাকে সংযত রাখে। সাধারণভাবেই যা প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য ও মাধুর্য যেন জনসমক্ষে প্রকাশ না করে। তাদের ঘাড় ও বুক যেন মাথার ওড়না দ্বারা ঢাকা থাকে। স্বামী, পিতা, শ্বশুর, ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনা, আত্মীয়া, দাসী, যৌনকামনা রহিত পুরুষ কর্মচারী, নারী-অঙ্গ সম্পর্কে অসচেতন শিশু ছাড়া অন্য কারো সামনে যেন তাদের সৌন্দর্য-মাধুর্য প্রকাশিত না হয়, সে ব্যাপারে তাদের সচেতন থাকতে হবে। হাঁটার সময় তারা যেন এমনভাবে পা না নাড়ায়, যা তাদের গোপন সৌন্দর্যের দিকে অন্যের মনোযোগ আকৃষ্ট করে। হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সবসময় সকলে মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো”; সুরা আল আহযাব (৩৩) আয়াত ৫৯ : “হে নবি! তুমি তোমার স্ত্রী, কন্যা ও বিশ্বাসী নারীদের বলো, তারা যেন (জনসমক্ষে) তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের (শালীন মহিলা হিসেবে) চিনতে সুবিধা হবে এবং কেউ উত্ত্যক্ত করবে না। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু”)। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে নর ও নারী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় (ছেলেরা টি-শার্ট পরে বাহিরে ঘুরতে পারবে, মেয়েরা কেন নয়), বরং পরস্পরের সহযোগী ও পরিপূরক। তাই, মুমিনদেরকে বিবেক ও বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করতে হবে যে, শালীন পোষাক পরিধান করার মাধ্যমেই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পায় (পোশাকের এই বিধান মেনে চলা মূলত মহান স্রষ্টার আদেশের প্রতি মস্তক অবনত করা এবং তাকওয়া বা খোদাভীতির বহিঃপ্রকাশ), মুমিনদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায় (শালীন পোশাক সমাজে একে অপরের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কুদৃষ্টি ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে) এবং বান্দার হক ও সামাজিক দায়িত্ব বজায় থাকে (যখন একজন মুমিন মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দেওয়া এই সীমানা মেনে চলেন, তখন তিনি পরোক্ষভাবে সমাজের অন্য মানুষের চোখের ও মনের পবিত্রতা রক্ষার মাধ্যমে বান্দার হক পালনেও ভূমিকা রাখেন)।

৯. আজকের পৃথিবী শত শত কোটি মানুষের বসবাস হলেও আমাদের আদি পিতা একজন এবং আদি মাতা একজন, অর্থাৎ আমাদের সবার মূল উৎস এক। গোটা মানবজাতি হজরত আদম আঃ এবং হজরত হাওয়া আঃ মাধ্যমেই অস্তিত্ব লাভ করেছে। বর্তমান পৃথিবীতে যদিও বিভিন্ন বর্ণ, জাতি, বংশ, ও ভাষা রয়েছে, তবুও আমাদের যাত্রা ধারা শুরু হয়েছিল একজন মা ও একজন বাবা থেকে। মানবজাতির মূল উৎস এক এবং অনন্য, তাই বর্ণ, ভাষা, বংশ বা জাতীয়তার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে কোনো প্রকার বৈষম্য বা ভেদাভেদ করার কোনো যৌক্তিক বা নৈতিক সুযোগ নেই। যারা বিভেদ টানে তারা ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত। আমাদের মূল উৎস এক হলেও, যেহেতু ভৌগোলিকভাবে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করি এবং সেসব অঞ্চলের জলবায়ুও (বায়ুর তাপ, চাপ, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাত, অক্ষাংশ, উচ্চতা, সমুদ্র থেকে দূরত্ব, বনভূমি ও সমুদ্রস্রোত) ভিন্ন, তাই মানুষের বর্ণ, দেহাকৃতি, ভাষা এবং জীবন যাপন রীতিও ভিন্ন। বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করে যে, মানুষের গায়ের রং (মেলানিন), শরীরের গঠন বা উচ্চতা মূলত হাজার হাজার বছর ধরে নির্দিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ু, সূর্যের আলো এবং ভৌগোলিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ফসল। প্রকৃতিগতভাবে ভাষা বা সংস্কৃতির ভিন্নতা কেবলই মানব সভ্যতার সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যকে প্রকাশ করে। এটি কোনোভাবেই একজন মানুষকে অন্যজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট প্রমাণ করার মাপকাঠি হতে পারে না। জন্মের ভিত্তিতে বা বংশের গৌরবে কোনো মানুষ বা জাতি অন্য কোনো জাতির ওপর অগ্রাধিকার পেতে পারে না। পৃথিবীর সব মানুষ জন্মগতভাবে সমান অধিকার ও মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। মানুষ যদি সবাই হুবহু এক হতো এবং তাদের কোনো আলাদা দল বা পরিচয় না থাকত, তবে সমাজবদ্ধভাবে বাস করা কঠিন হতো। জাতি ও গোত্র মানুষকে একে অপরকে চেনার এবং সামাজিক বন্ধন তৈরি করার একটি স্বাভাবিক সুযোগ করে দেয়। কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবারের পক্ষে জীবনের সব প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন গোত্র ও জাতির বৈচিত্র্যময় দক্ষতা, জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সম্মিলিত সমাজ বা সভ্যতা গড়ে ওঠে। মানবজাতির এই বিভিন্নতা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সৃষ্টির এক অপূর্ব নিদর্শন। ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য মানুষের জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলে। ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এই বিভাজন কোনো অহংকার, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা একে অপরকে ছোট করার জন্য নয়। বংশ বা জাতির ভিত্তিতে কেউ কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়, বরং শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো : মানুষের উন্নত চরিত্র, সততা এবং খোদাভীতি। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণে বর্ণবাদের মূলে আঘাত করে বলেছিলেন : "কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের, কিংবা কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের বা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই—শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি" (সুরা আল হুজরাত (৪৯) আয়াত ১৩: "হে মানুষ! তোমাদেরকে আমি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং বিভিন্ন সমাজ ও জাতিতে ভাগ করেছি, যেন তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে বেশি আল্লাহ-সচেতন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব জানেন, সব বিষয়ে সচেতন”)। সুতরাং, আমরা মুমিনেরা যেন কখনোই বর্ণ, ভাষা, বংশ বা জাতীয়তার উপর ভিত্তি করে কাউকে ছোট না করি, তাহলে আমরা মানুষের হক আদায়ে ব্যর্থ হব। 

১০. সর্বশক্তিমান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মুমিনদের অর্থনীতিতে সুদ হারাম, তবে লাভ-ক্ষতি ও বেচাকেনা হালাল। কেন ইসলামে সুদের কারবার হারাম তা যদি পর্যালোচনা করা হয় তবে এটা স্পষ্ট যে, ইসলামি অর্থব্যবস্থায় যে-কোনো আর্থিক লেনদেন এবং আয়ের পেছনে ঝুঁকি, শ্রম এবং পুঁজির একটি সুষম বণ্টন থাকতে হবে। ইসলামি নীতি অনুযায়ী, কোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক বা পরিচালনগত পরিশ্রম না করে কেবল সময়ের ব্যবধানে অর্থ থেকে আরও অর্থ তৈরি করা অন্যায়। সুদখোর বা সুদি বিনিয়োগকারী কোনো কাজ না করেই একটি নির্দিষ্ট লভ্যাংশ পেয়ে যায়, যা শ্রমের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। অন্যদিকে, সুদের অর্থনীতিতে সুদের বিনিয়োগের মাধ্যমে শুধু সুদখোর বা সুদি বিনিয়োগকারীর লাভই চিন্তা করা হয়, গ্রহীতা বা প্রতিষ্ঠান সুদে অর্থ নিয়ে বিনিয়োগ করে লাভ করেছে কিনা তার কোনো মূল্য সুদের অর্থনীতিতে নেই। সুদের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো : যদি গ্রহীতা বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মধ্যে পড়ে, তবুও সময়ের সাথে সাথে সুদের অর্থ বাড়তেই থাকে, যা গ্রহীতাকে প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ সুদের অর্থ দিতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। অথচ খুবই পরিতাপের বিষয়, আজ মুসলিম সমাজে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সুদের মহোৎসব চলছেই। রিজিকদাতা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিষেধ অমান্য করেই চলছে মুসলিম সমাজের নেতারা। ফলে মুসলিম বিশ্ব আজ চরম দুর্দশাগ্রস্ত জাতিতে পরিণত হয়েছে। মুসলিম সমাজের এই দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত হালাল রিজিক অন্বেষণ এবং সুদমুক্ত একটি কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২৭৫: "যারা সুদ (রিবা) খায়, তাদের অবস্থা হচ্ছে শয়তানের স্পর্শে সহজাত বিচারবুদ্ধি লোপ পাওয়া ব্যক্তির মতো। এজন্যেই তারা বলে, ব্যাবসা তো সুদের মতোই, অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন। যার নিকট তার প্রতিপালকের বিধান পৌঁছেছে এবং সুদ খাওয়া থেকে বিরত থেকেছে, তার অতীতের বিষয় সম্পূর্ণতই আল্লাহর এক্তিয়ারে। কিন্তু যারা বিধান জানার পরও সুদ খেতে থাকবে, জাহান্নামই হবে তাদের নিবাস। সেখানেই থাকবে তারা চিরকাল”; সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২৭৮ : “হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ-সচেতন থেকো। সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি সত্যি সত্যি তোমরা বিশ্বাসী হয়ে থাকো”; সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২৭৯ : “যদি তোমরা সুদ না ছাড়ো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা করো এবং সুদ পরিত্যাগ করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই প্রাপ্য হবে। তোমরা জুলুম কোরো না এবং তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না”; সুরা আল ইমরান (০৩) আয়াত ১৩০ : “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। বরং তোমরা আল্লাহ-সচেতন হও। তাহলেই তোমরা সফলকাম ও সুখী হবে”; সুরা রুম (৩০) আয়াত ৩৯ : “হে মানুষ, ধনসম্পত্তি বৃদ্ধির জন্যে তোমরা যে সুদি বিনিয়োগ করো, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের জন্যে শুদ্ধচিত্তে (জাকাত হিসেবেও) যা দান করো, তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়”)। মুসলিম সমাজে সুদের কারবার চালিয়ে যাওয়া মানে মানুষের হক (ইসলামি অর্থনীতিবিদদের মতে, সুসভ্য সমাজে সুদভিত্তিক ব্যবস্থা ধনীকে আরও ধনী এবং দরিদ্রকে আরও দরিদ্র করে তোলে। এটি সম্পদের সুষম বণ্টন ব্যাহত করে, যা সমাজের একটি বড়ো অংশকে চরম দুর্দশার দিকে ঠেলে দেয়; পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সুদকে ধ্বংস করেন এবং দান-সদকাকে বৃদ্ধি করেন। ফলে বাহ্যিকভাবে সুদি কারবারে লাভ দেখা গেলেও, সামগ্রিক অর্থনীতি ও জীবনে এর কোনো প্রকৃত কল্যাণ বা বরকত থাকে না) নষ্ট করা। অতএব, আমরা মুমিনেরা যেন পরকালের আজাবকে ভয় পেয়ে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতি ও বেচাকেনার অর্থনীতি চালু করি।

১১. ইসলামে ঘুস শুধু হারামই নয় বরং এটি একটি ভয়ানক অপরাধ, কারণ, এটি সমাজে জুলুম, অবিচার ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলে যা সহ্য করা মুমিনদের জন্য খুবই কঠিন। পরাক্রমশালী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘুষের মাধ্যমে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতে শুধু নিষেধই করেননি, একইসাথে বিচারক বা কর্তাব্যক্তিদের কাছে ঘুস হিসেবে সম্পদ পাঠানোকেও হারাম করেছেন। ঘুষের মাধ্যমে ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করা জঘন্য অপরাধ। মহানবি রসুলুল্লাহ (সা.) অভিশাপ (লানত) দিয়েছেন ঘুসদাতা এবং গ্রহীতা উভয়ের ওপরই, কারণ তারা উভয়ই এই হারাম কাজটি হতে সহায়তা করেছেন। তবে অনেক সময় দেখা যায়, নিজের ন্যায্য অধিকার আদায় করা বা বড়ো কোনো জুলুম থেকে নিজেকে রক্ষা করতে বিকল্প কোনো বৈধ উপায় যদি না থাকে, তখন বাধ্য হয়ে ঘুস দিতে হয়। এক্ষেত্রে ইসলামি ফিকহবিদদের (স্কলার) মতামত অনুযায়ী দাতা গুনাহ থেকে কিছুটা ছাড় পেতে পারেন (যদিও তা বর্জন করাই উত্তম)। তবে ঘুস গ্রহণকারীর জন্য এটি সর্বাবস্থায় সম্পূর্ণ হারাম। মুমিনদেরকে সবসময় মনে রাখতে হবে, ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত উপার্জনে যদি কোনো ব্যক্তি জীবন ধারণ করে, সেই ব্যক্তির কোনো দোয়া, ইবাদত বা নেক আমল মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দরবারে কখনই কবুল হবে না। (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ১৮৮: "(হে বিশ্বাসীগণ) তোমরা একে অন্যের ধনসম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। আর জেনেশুনে অন্যায়ভাবে অপরের ধনসম্পত্তির কিছু অংশ গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকাজে সংশ্লিষ্টদের প্রভাবিত কোরো না”; সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ২৯, ৩০ : “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অপরের অর্থবিত্ত অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। অবশ্য তোমরা মিলেমিশে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যাবসা করতে পারো। আর তোমরা একে অপরকে হত্যা কোরো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি বড়োই মেহেরবান। আর যে ব্যক্তি বিদ্বেষবশত অন্যায়ভাবে তা করবে, আমি তাকে (অশান্তির) আগুনে পোড়াব, জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর আল্লাহর পক্ষে এটি খুব সহজ কাজ”; সুরা আল মায়েদাহ (০৫) আয়াত ৪২ : “(কারণ) হে নবি! ওরা মিথ্যাচারে অভ্যস্ত এবং হারাম মাল ভক্ষণে আসক্ত। ওরা তোমার কাছে বিচারের জন্যে এলে, তুমি ইচ্ছা করলে বিচার করতে পারো বা উপেক্ষাও করতে পারো। তুমি ওদের উপেক্ষা করলেও ওরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তবে যদি বিচার করো, তাহলে ইনসাফ অর্থাৎ ন্যায়বিচার করবে। আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন”)। সুতরাং, আমরা মুমিনেরা যেন ঘুষের ধারেকাছে না যাই বরং এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ঘুসকে সমাজ থেকে চিরতরে বিদায় করে মানুষের হক আদায় করি।

১২. অন্যের সম্পদ তার অজান্তে নিয়ে নেওয়া (চুরি), অন্যের সম্পদ দলবেঁধে এসে অস্ত্র দেখিয়ে নিয়ে নেওয়া (ডাকাতি), এবং অন্যের সম্পদ হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিয়ে নেওয়া (ছিনতাই) ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ অপরাধ। এই অপরাধগুলোর ওজন এত বেশী যে, এটি সমাজে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, সমাজকে করে কলুষিত। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বিধ্বংসী হলো রাষ্ট্রীয়ভাবে রাষ্ট্রীয় কাজে নিযুক্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের চুরি, যাকে অন্যভাষায় দুর্নীতি বলা হয়, যেটি একটি সমাজকে চরম ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। চুরি, ডাকাতি, ও ছিনতাই মানুষের জান, মাল এবং ইজ্জতের নিরাপত্তা উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। সেজন্য ইসলামি শরীয়াহ এই অন্যায়গুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কথা ঘোষণা করেছে। চুরি প্রতিরোধে ব্যক্তির হাত কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে, যাতে সমাজে কেউ অন্যের সম্পদ চুরি করার নিমিত্তে হাত দেওয়ার সাহস না পায়। ডাকাতি ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের জন্য চার ধরনের কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে—মৃত্যুদণ্ড, ক্রুশবিদ্ধ করা, বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে ফেলা ও দেশান্তর করা। ডাকাতির শাস্তি চুরির চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ এ কারণে যে, ডাকাতির মাধ্যমে সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করা হয় এবং মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হয়। প্রকাশ্যে বা শক্তির জোরে মানুষের সম্পদ কেড়ে নেওয়া, যাকে ছিনতাই বলা হয়, এ প্রসঙ্গে মহানবি রসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে অন্যের সম্পদ ছিনতাই করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়” (সুরা আল মায়েদাহ (০৫) আয়াত ৩৮, ৩৯: "চোর পুরুষ হোক অথবা নারী, তার ডান হাত কেটে ফেলো। আল্লাহর তরফ থেকে এ হচ্ছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি—তাদের কর্মফল। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। কিন্তু কেউ এ অন্যায় করার পর তওবা করলে এবং নিজেকে শুধরে নিলে (অর্থাৎ ধরা পড়ার আগেই চোরাইমাল প্রত্যর্পণ করলে) আল্লাহ অবশ্যই তার তওবা কবুল করবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”; সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ২৯, ৩০ : "হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অপরের অর্থবিত্ত অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। অবশ্য তোমরা মিলেমিশে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যাবসা করতে পারো। আর তোমরা একে অপরকে হত্যা কোরো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি বড়োই মেহেরবান। আর যে ব্যক্তি বিদ্বেষবশত অন্যায়ভাবে তা করবে, আমি তাকে (অশান্তির) আগুনে পোড়াব, জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর আল্লাহর পক্ষে এটি খুব সহজ কাজ”; সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ১৮৮ : "(হে বিশ্বাসীগণ) তোমরা একে অন্যের ধনসম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। আর জেনেশুনে অন্যায়ভাবে অপরের ধনসম্পত্তির কিছু অংশ গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকাজে সংশ্লিষ্টদের প্রভাবিত কোরো না”)। সুতরাং, মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে, পরাক্রমশালী, দয়ালু ও মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজের অধিকার (যেমন: নামাজ, রোজা) ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু বান্দার অধিকার (যেমন: সম্পদ আত্মসাৎ, সম্মানহানি ) কখনোই ক্ষমা করবেন না, যতক্ষণ না সেই ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজে ক্ষমা করে। তাই চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মাধ্যমে যে সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়েছে, তা শুধু তওবা করলেই মাফ হবে না; বরং প্রকৃত মালিকের কাছে সেই সম্পদ বা তার সমপরিমাণ মূল্য ফিরিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক।

১৩. ইসলামে অশ্লীলতা এমন একটি জঘন্য অপরাধ, যেটিকে মানবচরিত্র, পরিবার এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। একজন ব্যক্তি যখন অশ্লীলতায় ডুবে থাকে, তখন তার লজ্জা, হায়া এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ থাকে না। ফলে, ব্যক্তিটির মনস্তাত্ত্বিক এবং আচরণগত অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায় অশালীন, কদর্য, কুরুচিপূর্ণ, ও নির্লজ্জতায় ভরপুর। মহানবি রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যার লজ্জা নাই তার ইমানও নাই"। আজকের মুসলিম সমাজে অশ্লীলতা এমনভাবে বিস্তার করেছে যে, পরকীয়া, ডিভোর্স এবং পারিবারিক কলহ যেন নিত্যদিনের ব্যাপার। সমাজও যেন অশ্লীলতাকে একপ্রকার মেনে নিয়েছে। প্রতিদিন চোখ খুললেই দেখা যায় অশ্লীল চিন্তা, পোষাক, ও বিনোদন সমাজের চারিদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে অশ্লীলতাই সমাজের সুস্থ ও শান্তিময় পারিবারিক পরিবেশ ধ্বংস করে দেয়। তাই, মুমিনদেরকে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, কারণ এটি মানুষের ইমানে আঘাত করে, বান্দার হক নষ্ট করে দেয় (সুরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ৩৩ : “হে নবি! ওদের বলো, ‘আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন সব অশ্লীলতাকে, সব ধরনের পাপাচারকে এবং অসংগত ঈর্ষা ও শত্রুতাকে। সেইসাথে নিষিদ্ধ করেছেন কোনোকিছুকেই আল্লাহর সাথে শরিক করা, যার সপক্ষে তিনি কোনো সনদ পাঠাননি। আসলেই তিনি বলেছেন কিনা, সে-সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে আল্লাহর নামে কোনো কথা বলাকেও তিনি হারাম করেছেন”; সুরা বনি ইসরাইল (১৭) আয়াত ৩২ : “তোমরা জেনার (ব্যভিচার, পরকীয়া বা অবৈধ যৌনাচারের) কাছেও যেও না। এটা অশ্লীল ও জঘন্য পাপাচার।”; সুরা আন নূর (২৪) আয়াত ১৯ : “যারা বিশ্বাসীদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়াতে চায়, তাদের জন্যে দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি। আসল সত্য আল্লাহ জানেন, যা তোমরা জানো না”)। অশ্লীলতাকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে হলে মুমিনদেরকে বাস্তবসম্মত কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, নারী ও পুরুষ উভয়ই যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে তার নির্দেশনা সমাজ থেকে জারি করা। দ্বিতীয়ত, পোশাকে ও চাল-চলনে শালীনতা বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া। তৃতীয়ত, যুবসমাজকে অশ্লীলতা থেকে বাঁচাতে সময়মতো এবং সহজ উপায়ে বিয়ের ব্যবস্থা করা, যার মধ্যে অন্যতম হলো যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের জোগান দেওয়া ও একইসাথে বিয়ের ব্যাপারে উৎসাহিত করা। এবং চতুর্থত, সমাজে যে ভয়াবহ অশ্লীলতার প্রচার চলছে তা আইন ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বন্ধ করা, একইসাথে শরিয়াহভিত্তিক বিনোদনের ব্যবস্থা করা।

১৪. ইসলামে প্রতিবেশীর হককে খুবই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইবাদতের পর মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি প্রতিবেশীর (নিকটতম প্রতিবেশী ও দূরবর্তী প্রতিবেশী) প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন (সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ৩৬ : “(হে মানুষ) তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে। কোনোকিছুকে তাঁর সাথে শরিক করবে না। পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম-অভাবী, নিকট ও দূর প্রতিবেশী, সঙ্গীসাথি, পথিক ও অধীনদের সাথে সদ্‌ব্যবহার করবে। নিশ্চয়ই দাম্ভিক ও অহংকারীকে আল্লাহ অপছন্দ করেন”)। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী প্রতিবেশীর হক বা অধিকারকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পার : অমুসলিম প্রতিবেশী, যার রয়েছে একটি হক (প্রতিবেশীর হক); মুসলিম প্রতিবেশী, যার রয়েছে দুটি হক (ইসলামের হক ও প্রতিবেশীর হক); এবং আত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশী যার রয়েছে তিনটি হক (আত্মীয়তার হক, ইসলামের হক ও প্রতিবেশীর হক)। ইসলামে প্রতিবেশীর সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধনকে এতটাই গুরুত্ব ও জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে : হয়তবা তাদেরকে (প্রতিবেশীদের) রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের মতই ওয়ারিশ বা সম্পত্তির অংশীদারিত্বও দেওয়া জায়েজ হবে (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬০১৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬২৪ : “জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে এতোবেশি তাগিদ দিচ্ছিলেন যে, আমার মনে হচ্ছিল শীঘ্রই হয়ত প্রতিবেশীকে (উত্তরাধিকার সূত্রে) সম্পদের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেওয়া হবে”)। মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে প্রতিবেশীর হক লঙ্ঘনকে ইসলামে অত্যন্ত বড়ো গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তাই, প্রতিবেশীর প্রতি মুমিনদের যে-সব দায়িত্ব রয়েছে তা হলো : কষ্ট না দেওয়া (কথা, কাজ, উচ্চ শব্দ, আবর্জনা বা অন্য কোনোভাবে প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেওয়া), সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো (প্রতিবেশী অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, মারা গেলে জানাজায় অংশ নেওয়া, বিপদে সান্ত্বনা দেওয়া এবং আনন্দের দিনে অভিনন্দন জানানো), উপহার আদান-প্রদান (ছোট কোনো উপহার হলেও তা সানন্দে গ্রহণ করা এবং দেওয়া), এবং গোপনীয়তা রক্ষা ও নিরাপত্তা দেওয়া (প্রতিবেশীর বাড়ির ভেতরের দিকে না তাকানো, তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পত্তি ও পরিবারের নিরাপত্তা বিধান করা)। 

১৫. জিহাদ মুমিনদের জন্য ফরজ কাজ। এই ফরজ কাজটির শাব্দিক অর্থ ‘জিহাদ’ অত্যন্ত ব্যাপক তাৎপর্য বহন করে। জিহাদের আক্ষরিক অর্থ হলো কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা, পরিশ্রম বা সংগ্রাম করা। সর্বোপরি, মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর দ্বিনকে সমুন্নত রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টাকে জিহাদ বলা হয় (সুরা আছ-ছফ (৬১) আয়াত ১০, ১১, ১২, ১৩ : “হে বিশ্বাসীগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বিনিয়োগের সন্ধান দেবো, যা (ইহকাল ও পরকালে) তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আজাব থেকে রক্ষা করবে? তা হচ্ছে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলে পূর্ণ বিশ্বাস রাখবে এবং আল্লাহর পথে জানমাল দিয়ে সংগ্রাম করবে। এতেই তোমাদের মঙ্গল, যদি তোমরা বুঝতে! (যদি তোমরা তা করো, তবে) আল্লাহ তোমাদের পাপ মোচন করবেন। তোমাদের দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে থাকবে প্রবহমান ঝর্ণাধারা। চিরকাল থাকার জন্যে দেবেন জান্নাতের উত্তম বাসস্থান। আর এটাই মহাসাফল্য। আর তিনি দান করবেন তোমাদের প্রিয় চাওয়া—পার্থিব জীবনেই আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। (অতএব, হে নবি!) বিশ্বাসীদের এ সুখবর দাও”)। সেজন্য, মুমিনেরা দিন-রাত জিহাদের মাধ্যমে নিজেকে অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। মুমিনদের এই আত্মশুদ্ধির সংগ্রামকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এ কারণে যে, মানুষের ভেতরের অন্যায় ইচ্ছাকে দমন করাই হলো সমাজ থেকে অন্যায় দূর করার প্রথম ও প্রধান ধাপ। তা ছাড়া, ইসলামে জিহাদের ধারণাটি বহুমুখী এবং এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে : আত্মশুদ্ধি বা নফসের জিহাদ (নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি, অন্যায় ইচ্ছা, অলসতা ও পাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখার নিরন্তর সংগ্রামকে ‘বড়ো জিহাদ’ বা আত্মিক জিহাদ বলা হয়), শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ (কুপ্ররোচনা ও কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা করা), সামাজিক ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম (সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সত্য প্রচার এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো), এবং সশস্ত্র জিহাদ (ইসলামি শরিয়তের কঠোর নিয়ম ও শর্তাধীনে (যেমন—রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও আত্মরক্ষা) কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই। এটি সবসময় সবার জন্য ফরজ নয়, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী ‘ফরজে কিফায়া’ কিংবা বিশেষ অবস্থায় ‘ফরজে আইন’ হয়ে থাকে)। অপরপক্ষে, মুমিনেরা যদি জিহাদে অংশগ্রহণ না করে তাহলে মানুষের হক লঙ্ঘিত হবে, কারণ তখন শয়তানের কুপ্ররোচনা ও কুমন্ত্রণায় মুমিনদের দ্বারা সমাজে খারাপ কাজ হবে, সমাজের ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাধাগ্রস্ত হবে এবং কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই (রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও আত্মরক্ষার জন্য) থেমে যাবে।

পরিশেষে, পবিত্র কুরআন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জ্ঞানগর্ভ কথা। পবিত্র কুরআনে ৬,৬৬৬ টি আয়াত রয়েছে। আমাদের মুমিনদেরকে এই সবগুলো আয়াতই পড়তে এবং উপলব্ধি করতে হবে যাতে মানুষের অন্যতম হকগুলো পালন করতে পারি।

 

Find Articles, Fatwas, And Knowledge

Search by topic, keyword, or category and press enter.