আল্লাহ সুবাহানাতায়ালা এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন মহাবিশ্বের সবকিছুই এবং তিনি জানেন মহাবিশ্বের কোথায় কি ঘটেছিল, কি ঘটছে এবং কি ঘটবে (সূরা আম্বিয়া (২১) আয়াত ৩০ : “কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না?”; সূরা আল-যুমার (৩৯) আয়াত ৬২ : “আল্লাহ সর্বকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন”; সূরা আল-ফুরকান (২৫) আয়াত ৫৯ : “তিনি নভোমন্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের অন্তর্বর্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃস্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি পরম দয়াময়। তাঁর সম্পর্কে যিনি অবগত, তাকে জিজ্ঞেস কর”; সূরা আল-আনআম (০৬) আয়াত ১০২ : “তিনিই আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা। তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তিনিই সব কিছুর স্রষ্টা। অতএব, তোমরা তাঁরই এবাদত কর। তিনি প্রত্যেক বস্তুর কার্যনির্বাহী”)। আল্লাহ সুবাহানাতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ এবং তিনি জানেন মানুষের অন্তরে ও মনে কী আছে, সেই মানুষের শিশু হয়ে এই পৃথিবী আগমনের আগেই (সূরা রাদ (১৩) আয়াত ৮, ৯ : “আল্লাহ জানেন প্রত্যেক নারী যা গর্ভধারণ করে এবং গর্ভাশয়ে যা সংকুচিত ও বর্ধিত হয়। এবং তাঁর কাছে প্রত্যেক বস্তুরই একটা পরিমাণ রয়েছে। তিনি সব গোপন ও প্রকাশ্য বিষয় অবগত, মহোত্তম, সর্বোচ্চ মর্যাদাবান”; সূরা আন-নাজম (৫৩) আয়াত ৩২ : “যারা বড়ো বড়ো গুনাহ ও অশ্লীলকার্য থেকে বেঁচে থাকে, ছোটোখাটো অপরাধ করলেও নিশ্চয় আপনার পালনকর্তার ক্ষমা সুদূর বিস্তৃত। তিনি তোমাদের সম্পর্কে ভালো জানেন, যখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা থেকে এবং যখন তোমরা মাতৃগর্ভে কচি শিশু ছিলে। অতএব তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। তিনি ভালো জানেন কে সংযমী”)। মানুষ ভালো এবং মন্দ কাজ করার ক্ষমতা নিয়ে এই দুনিয়াতে এসেছে পরীক্ষা দেবার জন্য কে কাজে উত্তম, আল্লাহ সুবাহানাতায়ালার হক পালনে (সূরা আম্বিয়া (২১) আয়াত ৩৫ : “প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে”; সূরা মুহাম্মদ (৪৭) আয়াত ৩৩ : “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রসুলের (সা.) আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট করো না”)। সুতরাং, আমরা (মুমিন মুসলিমরা) অবশ্যই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবাহানাতায়ালার হক পালন করব, পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আল্লাহ সুবাহানাতায়ালার আদেশ পালনের মাধ্যমে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আল্লাহ সুবাহানাতায়ালার অন্যতম আদেশগুলো, যা আমাদের (মুমিন মুসলিমদের) জন্য অবশ্যই পালনীয়, তা বর্ণনা করা হলো:
১. আল্লাহ সুবাহানাতায়ালা এক ও অদ্বিতীয় (সূরা এখলাছ (১১২) আয়াত ১, ২, ৩, ৪ : “বল, ‘তিনিই আল্লাহ, এক -অদ্বিতীয়; আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন, সবাই তার মুখাপেক্ষী; ‘তিনি কাউকে জন্ম দেন নাই এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয় নাই, ‘এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নাই”); তিনি এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা এবং মালিক (সূরা ফুরকান (২৫) আয়াত ২ : “তিনি হলেন যাঁর রয়েছে নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডল রাজত্ব। তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি। রাজত্বে তাঁর কোন অংশীদার নেই। তিনি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে শোধিত করেছেন পরিমিতভাবে”)। সুতরাং, আমরা (মুমিন মুসলিমরা) আল্লাহ সুবাহানাতায়ালাকে এক ও অদ্বিতীয় রব হিসেবে বিশ্বাস করি এবং তার ইবাদতে কাউকে শরিক করি না (সূরা আল-যুমার (৩৯) আয়াত ৬৫, ৬৬, ৬৭ : “আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের পতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরিক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন। বরং আল্লাহরই এবাদত করুন এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত থাকুন। তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি। কেয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোতে এবং আসমান সমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র। আর এরা যাকে শরিক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে”)।
২. আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার অন্যতম হক : বান্দার রবের প্রতি ঈমান এনে সালাত আদায় করা (সূরা আল-বাকারা (০২) আয়াত ৪৩ : “আর নামাজ কায়েম কর, জাকাত দান কর এবং নামাযে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়”)। সালাত আদায় করার মাধ্যমেই বান্দা তার রবের নৈকট্য লাভ করতে যাবতীয় আরজি পেশ করতে পারে (সূরা আল-বাকারা (০২) আয়াত ৪৩ : “ধৈর্যের সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাযের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব”)। এজন্য আমাদেরকে সঠিক সময়ে সালাত আদায় করতে হবে (সূরা আল-বাকারা (০২) আয়াত ১০৩ : “অতঃপর যখন তোমরা নামাজ সম্পন্ন কর, তখন দণ্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর। অতঃপর যখন বিপদমুক্ত হয়ে যাও, তখন নামাজ ঠিক করে পড়। নিশ্চয় নামাজ মুসলমানদের উপর ফরজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে”)। অবশ্যই আমাদেরকে সুন্দর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোষাকে এবং খাবার-পানীয় খেয়ে সালাত আদায় করতে হবে (সূরা আরাফ (০৭) আয়াত ৩১ : “হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না”)। সালাত মুমিনদেরকে আল্লাহর স্মরণে তাদের হৃদয়ে প্রশান্তি দেয় এবং খারাপ কাজ হতে রক্ষা করে (সূরা ত্বোয়া-হা (২০) আয়াত ১৪ : “আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে নামাজ কায়েম কর”; সূরা আনকাবুত (২৯) আয়াত ৪৫ : “আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামাজ কায়েম করুন। নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর”)।
৩. আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা আমাদের রিজিকদাতা (সূরা আল-আনকাবুত (২৯) আয়াত ৬০ : "এমন অনেক জন্তু আছে, যারা তাদের খাদ্য সঞ্চিত রাখে না। আল্লাহই রিজিক দেন তাদেরকে এবং তোমাদেরকেও। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ")। তিনি সমাজে আর্থিকভাবে দুর্বল লোকদের জাকাতের মাধ্যমে তাদের আয় বাড়ানোর ব্যবস্থাপনাকে বাধ্যতামূলক করেছেন, ঐ সমস্ত লোকদের জন্য যাদের নিসাব সীমার উপরে সঞ্চয় রয়েছে (সূরা আল-বাকারা (০২) আয়াত ৪৩ : “আর নামাজ কায়েম কর, জাকাত দান কর এবং নামাযে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়”; সূরা আত-তাওবা (০৯) আয়াত ১০৩, ১০৪: “তাদের মালামাল থেকে জাকাত গ্রহণ কর, যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে। আর তুমি তাদের জন্য দোয়া কর, নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনা স্বরূপ। বস্তুত, আল্লাহ সবকিছুই শোনেন, জানেন। তারা কি একথা জানতে পারেনি যে, আল্লাহ নিজেই স্বীয় বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং জাকাত গ্রহণ করেন? বস্তুত; আল্লাহই তওবা কবুলকারী, করুণাময়”)। জাকাত গ্রহণ করতে পারবে এমন আর্থিক ভাবে অতীব দুর্বল আট ধরনের সদস্যরা হলেন : দরিদ্র, অভাবী, জাকাত সংগ্রাহক এবং বিতরণকারী, নতুন মুসলিম, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, ইসলাম প্রচার, এবং মুসাফির (সূরা আত-তাওবা (০৯) আয়াত ৬০ : “জাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারি ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে; এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”)। একজন মুমিন, জাকাত আদায়ের মাধ্যমে তার রবের অশেষ সওয়াব ও রহমত লাভ করার সাথে সাথে, সম্পদকে পবিত্র এবং আত্মাকে কৃপণতা ও লোভ থেকে মুক্ত রাখতে পারে।
৪. সাদাকা হলো মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে পুরুষ এবং নারী উভয়ের নিঃস্বার্থভাবে সম্পদ বা ভালো কিছু দান করা, যেটিকে ইসলামে অন্যতম একটি ঐচ্ছিক অর্থনৈতিক কার্যকলাপ হিসাবে বিবেচনা করা হয় (সূরা মুনাফিকুন (৬৩) আয়াত-৯,১০,১১ : “মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবে হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সাদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন”)। সাদাকা আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার এমন একটি হক : যা পালনের মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হয়, বিপদ দূর হয় এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায়। ইসলামে বান্দার প্রতিটি ভালো কাজই সাদাকা হিসাবে গণ্য করা হয় : যেমন : ভাল ব্যবহার, মুচকি হাসা, মানুষকে সাহায্য করা, বা সুপরামর্শ দেওয়া ইত্যাদি।
৫. কর্জে হাসানা হলো : সুদমুক্ত ঋণ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির (সূরা আল-বাকারা (০২) আয়াত ২৩৮ : “এমন কে আছে যে, আল্লাহকে কর্জ দেবে, উত্তম কর্জ, অতঃপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ-বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। আল্লাহই সংকুচিত করেন এবং তিনিই প্রশস্ততা দান করেন এবং তাঁরই নিকট তোমরা সবাই ফিরে যাবে”) উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক ভাবে নাজুক ব্যক্তিকে কোনো প্রকার লাভ বা অতিরিক্ত সুবিধা ছাড়াই দেওয়া হয়। কর্জে হাসানার কল্যাণে, একজন অসচ্ছল ব্যক্তি তার অভাব দূর করতে পারেন, চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারেন, এবং ছোট ব্যাবসা শুরুর মূলধন পেতে পারেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, সাধারণ সাদাকার চেয়ে কর্জে হাসানায় একজন ব্যক্তি ১৮ গুণ বেশি নেকি অর্জন করতে পারেন (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৪৩১ : “মিরাজের রাতে আমি জান্নাতের দরজায় লেখা দেখলাম যে, সাদাকার সওয়াব দশ গুণ বৃদ্ধি করা হয়, আর কর্জে হাসানার সওয়াব আঠারো গুণ বৃদ্ধি করা হয়”)। অতএব, আমরা কর্জে হাসানায় অংশগ্রহণ করে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সন্তুষ্টির পাশাপাশি অনেক সওয়াব লাভ করতে পারি।
৬. সাওম বা রোজা হলো আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হকের প্রতি বান্দার অন্যতম ইবাদত (সূরা আল-বাকারা (০২) আয়াত ১৮৩, ১৮৪, ১৮৫ : “হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পার। গণনার কয়েকটি দিনের জন্য, অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশির সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ করো এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তা’আলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর”), যার মাধ্যমে বান্দা তাকওয়া (আল্লাহকে ভয়), আত্মসংযম (মানুষের ভেতরের পশুত্ব দমন ও চরিত্র সংশোধন), আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি (শারীরিক ক্ষুধার মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্যলাভ), এবং সহানুভূতি (ক্ষুধার কষ্ট উপলব্ধি করে গরিব-দুঃখীর প্রতি সহানুভূতি) অর্জন করতে পারে। সাওম হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহ পানাহার এবং যাবতীয় পাপাচার ও ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থাকার ইবাদত। তা ছাড়া, সাওমের উপকারিতা আমরা শারীরিক (পরিপাকতন্ত্রের বিশ্রাম ও শরীরের টক্সিন নিরাময়) ও মানসিক (ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক শৃঙ্খলার উন্নতি) উভয়ভাবে পেয়ে থাকি। সুতরাং, সাওমের মাধ্যমে আমরা পানাহারই বর্জন করিনা, বরং এটি আমাদের জিহ্বা, চোখ, কান ও অন্তরেরও রোজা, যার ফলশ্রুতিতে আমরা একটি পরিপক্ব ও নৈতিক চরিত্র গঠনের সহায়তা পাই।
৭. হজ্জ ইসলামের অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত (সূরা হাজ্জ্ব (২২) আয়াত ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ : “যখন আমি ইব্রাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দন্ডায়মানদের জন্যে এবং রকু সেজদাকারীদের জন্যে। এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময়। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্থকে আহার করাও। এরপর তারা যেন দৈহিক ময়লা দূর করে দেয়, তাদের মানত পূর্ণ করে এবং এই সুসংরক্ষিত গৃহের তাওয়াফ করে”), যেটি পালন করতে একজন মুসলিম নারী বা পুরুষকে শারীরিক এবং আর্থিকভাবে সক্ষম হতে হয়। প্রতিবছর জিলহজ মাসে এই হজ্জ পালনে লক্ষ লক্ষ মুসলমান সারা বিশ্ব থেকে সৌদিআরবে আগমন করেন। পবিত্র স্থানসমূহ (মক্কা, মদিনা, মিনা) পরিদর্শনের মাধ্যমে এটি শুরু হয়, যা তাওহিদ, বিনয়, সাম্য ও আত্মত্যাগের এক মহান নিদর্শন। সমবেত সৌভাগ্যবান মুসলমানদের জন্য হজ্জের এই ইবাদত গুনাহ মাফ ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ এনে দেয়।
৮. বান্দার সব প্রকার কবিরা গুনা থেকে বেঁচে থাকা আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার অন্যতম হক। মন্দ ও অশ্লীলতা, অবৈধ (বিয়ে বহির্ভূত) নারী-পুরুষ মেলামেশা, এবং অশালীন পোষাক আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ (সূরা নুর (২৪) আয়াত ২, ৩ : “ব্যভিচারিণী নারী, ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী নারী অথবা মুশরিকা নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে এবং এদেরকে মুমিনদের জন্যে হারাম করা হয়েছে”)। একইসাথে ইসলামের আলোকেও খুবই জঘন্য এবং নিন্দিত কাজ (সূরা নুর (২৪) আয়াত ২৬ : “দুশ্চরিত্রা নারীকূল দুশ্চরিত্র পুরুষকুলের জন্যে এবং দুশ্চরিত্র পুরুষকুল দুশ্চরিত্রা নারীকুলের জন্যে। সচ্চরিত্রা নারীকুল সচ্চরিত্র পুরুষকুলের জন্যে এবং সচ্চরিত্র পুরুষকুল সচ্চরিত্রা নারীকুলের জন্যে। তাদের সম্পর্কে লোকে যা বলে, তার সাথে তারা সম্পর্কহীন। তাদের জন্যে আছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা”) । এই চরম অসৎ, নিকৃষ্ট ও দূর্বৃত্তিপূর্ণ কাজ আজকের ইসলামি সমাজকে এতটাই কলুষিত করেছে : একজন মুমিন বান্দা প্রতিনিয়ত এজন্য অকল্পনীয় কষ্ট পান। সুতরাং, মুমিনদেরকে (সূরা আঁত তওবা (০৯) আয়াত ৭১ : “মুমিন নর ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু; এরা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজ নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য করে, এদেরকেই আল্লাহ কৃপা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”) অবশ্যই সুন্দর সমাজ গঠনে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে (সূরা নুর (২৪) আয়াত ৩১ : “ইমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগিনীপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাদি, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও”)।
৯. সুদ দেয়া, নেয়া, এবং সুদের কাজ করা হারাম। যদিও সুদের লেনদেন আমাদের ইসলামি সমাজে চরমভাবে বিরাজমান, যেটি আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার নাফরমানিতে আমাদেরকে প্রায় ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গিয়েছে (সূরা আল বাকারাহ (০২) আয়াত ২৭৫ : “যারা সুদ খায়, তারা কেয়ামতে দণ্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছে ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মতো! অথচ আল্লা’হ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে”; সূরা আল বাকারাহ (০২) আয়াত ২৭৮, ২৭৯ : “হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ইমানদার হয়ে থাক। অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমরা নিজের মূলধন পেয়ে যাবে। তোমরা কারও প্রতি অত্যাচার করো না এবং কেউ তোমাদের প্রতি অত্যাচার করবে না”)। সুতরাং, আমরা (মুমিনেরা) আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক পালনে অবশ্যই সুদ দেয়া, নেয়া, এবং সুদের কাজ করবো না এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক লড়াই গড়ে তুলব, যাতে সুদের লেনদেন সমাজ থেকে চিরতরে বিদায় নেয় (সূরা আছ-ছফ (৬১) আয়াত ১০, ১১, ১২, ১৩ : “মুমিনগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেবো, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনপণ করে জেহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম, যদি তোমরা বোঝ। তিনি তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন এবং এমন জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং বসবাসের জান্নাতে উত্তম বাসগৃহে। এটা মহাসাফল্য। এবং আরও একটি অনুগ্রহ দেবেন, যা তোমরা পছন্দ কর। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং আসন্ন বিজয়। মুমিনদেরকে এর সুসংবাদ দান করুন”)।
১০. আমরা আল্লাহ সুবাহনাতায়ালাকে ভালোবাসবো (সূরা আল বাকারাহ (০২) আয়াত ১৬৫ : “আর কোনো লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ইমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। আর কতই না উত্তম হতো যদি এ জালেমরা পার্থিব কোন কোন আজাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর”; সূরা আত তওবা (০৯) আয়াত ২৪ : “বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যাবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না”; সূরা আল ইমরান (০৩) আয়াত ৩১ : “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদেরকে ভালোবাসেন এবং তোমাদেরকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু”), তার আদেশ মেনে চলবো (সূরা আল-আনফাল (০৮) আয়াত ২০ : “হে ইমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রসুলের নির্দেশ মান্য কর এবং শোনার পর তা থেকে বিমুখ হয়ো না”; সূরা আন নিসা (০৪) আয়াত ৫৯ : “হে ইমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর-যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম”), এবং ভয় করবো যাতে প্রকৃত মুমিন হতে পারি (সূরা আল আহযাব (৩৩) আয়াত ০১ : “হে নবি! আল্লাহকে ভয় করুন এবং কাফের ও কপট বিশ্বাসীদের কথা মানবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”; সূরা আল হাশর (৫৯) আয়াত ১৮ : “মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী কালের জন্যে সে কি প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করতে থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা’আলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন”) : দুনিয়া এবং পরকালে (সূরা আল বাকারাহ (০২) আয়াত ২০১ : “আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে-হে পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদিগকে দোজখের আজাব থেকে রক্ষা কর”) সাফল্য লাভ করতে পারি।
১১. আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা আমাদের সৃষ্টিকর্তা। পিতামাতা আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা প্রদত্ত আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত : যাদের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর এই পৃথিবীতে আগমন এবং বেড়ে উঠা। পিতামাতার যত্ন ছাড়া একটি শিশু কখনই এই পৃথিবীতে সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকতে পারেনা। তাই, পিতামাতার ঋণ কোনো সন্তানই কোনোভাবেই এই পৃথিবীতে পরিশোধ করতে পারবে না। এজন্য আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা সবসময় পিতামাতার প্রতি সন্তানদের সদয় ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) আয়াত ২৩, ২৪ : “তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব-ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ্’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং বল তাদেরকে শিষ্ঠাচার পূর্ণ কথা। তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বল, হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন”; সূরা আন নিসা (০৪) আয়াত ৩৬ : “আর উপাসনা কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্নীয়, এতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে”)।
১২. আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার নির্দেশ পালনে আমাদের মুমিনদেরকে দল গঠন করে সৎ কাজের প্রতি আহ্বান এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করার সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে (সূরা আল ইমরান (০৩) আয়াত ১০৪ : “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে; আর তারাই হলো সফলকাম”)। প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, এবং শহরের ওয়ার্ডগুলোর জ্ঞানী মুমিনেরা এই সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলে তাদের নিজ এলাকার দলের অগ্রভাগে থেকে ইনসাফের সমাজ গড়ে তুলবেন (সূরা মুহাম্মদ (৪৭) আয়াত ০৭ : “হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ় প্রতিষ্ঠ করবেন”)। অবশ্যই জ্ঞানী মুমিনেরা কঠোর পরিশ্রম এবং আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার বরকতে সফলকাম হবেন।
১৩. এই বিস্ময়কর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোটি কোটি সৃষ্টি প্রতিনিয়ত আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার প্রশংসায় নিয়োজিত (সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) আয়াত ৪৪ : “সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে, সমস্ত কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু তাদের পবিত্রতা, মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পার না। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ”; সূরা আন-নূর (২৪) আয়াত ৪১ : “তুমি কি দেখ না যে, নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডলে যারা আছে, তারা এবং উড়ন্ত পক্ষিকুল তাদের পাখা বিস্তার করতঃ আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই তার যোগ্য এবাদত এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি জানে। তারা যা করে, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত”; সূরা হাজ্জ্ব (২২) আয়াত ১৮ : “তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু আছে নভোমণ্ডলে, যা কিছু আছে ভূমণ্ডলে, সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং অনেক মানুষ। আবার অনেকের উপর অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন, তাকে কেউ সম্মান দিতে পারে না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন”)। আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষও (মুমিন মুসলিমরা) দিনরাত বিভিন্ন ইবাদতের (নামাজ, জিকির, ইসলামি অর্থনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ) মাধ্যমে মহান রবের প্রশংসায় মশগুল থাকে (সূরা আল-ইনসান (৭৬) আয়াত ২৫, ২৬ : “এবং সকাল-সন্ধ্যায় আপন পালনকর্তার নাম স্মরণ করুন। রাত্রির কিছু অংশে তাঁর উদ্দেশে সেজদা করুন এবং রাত্রির দীর্ঘ সময় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করুন”; সূরা আল-আযহাব (৩৩) আয়াত ৪১, ৪২ : "মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। এবং সকাল বিকাল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা কর”)। সুতরাং, আমরা মুমিনেরা যখনই সময় পাবো মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার প্রশংসা এবং পবিত্রতা ঘোষণা করব (সূরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ২০৫ : “আর স্মরণ করতে থাক স্বীয় পালনকর্তাকে আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এবং এমন স্বরে যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বে-খবর থেকো না”), যদিও আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার প্রশংসা এবং পবিত্রতা অনন্তকাল করলেও শেষ হবে না (সূরা লোকমান (৩১) আয়াত ২৭ : “পৃথিবীতে যত বৃক্ষ আছে, সবই যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথেও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও তাঁর বাক্যাবলি লিখে শেষ করা যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”)।
১৪. আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক পালনে আমাদেরকে উত্তরাধিকার সম্পদের অংশ ওয়ারিশদের মধ্যে সঠিকভাবে বণ্টন করতে হবে (সূরা আন নিসা (০৪) আয়াত ১১ : “আল্লাহ তোমাদের সন্তান সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছেন : এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান; কিন্তু কেবল কন্যা দুই-এর অধিক থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ, আর মাত্র এক কন্যা থাকলে তার জন্য অর্ধাংশ। তার সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ, সে নিঃসন্তান হলে এবং পিতা-মাতাই উত্তরাধিকারী হলে তার মাতার জন্য এক-তৃতীয়াংশ, তার ভাই-বোন থাকলে মাতার জন্য এক-ষষ্ঠাংশ, এ সবই সে যা অসিয়ত করে তা দেওয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারে কে তোমাদের নিকটতর, তা তোমরা অবগত নও। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর বিধান; আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”)। একজন শিশু (মেয়ে বা ছেলে) কোন পরিবারে জন্মগ্রহণ করবে, তা আল্লাহ সুবহানাতায়ালা নির্ধারণ করেন। মেয়ে শিশু বিয়ের পর অন্য বাড়িতে চলে যাবে, এই দোহাই দিয়ে তাকে সঠিকভাবে লালন-পালনে উদাসীনতা, সম্পদ থেকে বঞ্চিত বা তার নির্ধারিত অংশের কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতএব, পরিবারের প্রতিটি সদস্য যেন আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা নির্ধারিত উত্তরাধিকার সম্পদের অংশ পান সেদিকে পরিবার, সমাজ, এবং রাষ্ট্রকে সক্রিয় হতে হবে।
১৫. ইসলাম নারী এবং পুরুষ উভয়কে শালীন পোশাক পরতে নির্দেশনা দেয় : যাকে হিজাব বলা হয়। পুরুষের হিজাব : আঁটসাঁট নয়, এমন শালীন পোশাক যা নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢেকে রাখে; নারীর হিজাব : আঁটসাঁট নয়, এমন শালীন পোশাক যা মুখমণ্ডল ছাড়া মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ঢেকে রাখে (সূরা আল-আহযাব (৩৩) আয়াত ৫৯ : “হে নবি! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”; সূরা আন-নূর (২৪) আয়াত ৩০ : “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন”)। ইসলামি হিজাবের আওতায় শালীন পোশাকের পাশাপাশি ভদ্র ও নম্র আচরণ, সুন্দর কথাবার্তা, ভালো উদ্দেশ্য এবং অন্যদের সাথে শ্রদ্ধার সাথে মেলামেশাও অন্তর্ভুক্ত।
১৬. পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার সত্তা খুবই পবিত্র (সূরা আত-তাগাবুন (৬৪) আয়াত ০১ : “নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁরই। তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান”; সূরা আল হাশর (৫৯) আয়াত ২৩, ২৪ : “তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনিই একমাত্র মালিক, পবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তা দাতা, আশ্রয়দাতা, পরাক্রান্ত, প্রতাপান্বিত, মাহাত্নশীল। তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তা’ আলা তা থেকে পবিত্র। তিনিই আল্লাহ তা’আলা, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, রূপদাতা, উত্তম নাম সমূহ তাঁরই। নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়”)। সুতরাং, আমরা মুমিনেরা সর্বদা অজু এবং গোসলের মাধ্যমে নিজেদের পবিত্রতা অর্জন করব (সূরা আল মায়েদাহ (০৫) আয়াত ০৬ : “হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাযের জন্যে উঠ, তখন স্বীয় মুখমণ্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং পদযুগল গিঁটসহ। যদি তোমরা অপবিত্র হও, তবে সারা দেহ পবিত্র করে নাও এবং যদি তোমরা রুগ্ণ হও, অথবা প্রবাসে থাক, অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তয়ম্মুম করে নাও-অর্থাৎ, স্বীয় মুখ-মন্ডল ও হস্তদ্বয় মাটি দ্বারা মুছে ফেল। আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না, কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান-যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর”; সূরা আন-নিসা (০৪) আয়াত ৪৩ : “হে ইমানদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেও না, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ, আর (নামাযের কাছে যেও না) ফরজ গোসলের অবস্থায়ও যতক্ষণ না গোসল করে নাও। কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র, আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাক কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী গমন করে থাকে, কিন্তু পরে যদি পানিপ্রাপ্তি সম্ভব না হয়, তবে পাক-পবিত্র মাটির দ্বারা তয়ম্মুম করে নাও-তাতে মুখমণ্ডল ও হাতকে ঘষে নাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল”); একইসাথে সালাত, জিকির, কোরআন তেলওয়াত, এবং আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার উত্তম নাম সমূহ স্মরণ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার পবিত্রতা ও মহিমান্যতা ঘোষণা করব।
১৭. আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হল মানুষ। তিনি মানুষকে সর্বোত্তম শারীরিক গঠন, ভালো-খারাপ বোঝার বিবেক-বুদ্ধিমত্তা ক্ষমতা, ইচ্ছামতো স্বাধীনভাবে চলাফেরা, ও আধ্যাত্মিক বিকাশের ক্ষমতা দিয়ে এই পৃথিবীতে আনয়ন করেছেন পরীক্ষা করার জন্য কে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক পালনে উত্তম (সুরা মূলক (৬৭) আয়াত ২: “যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করিবার জন্য-কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল”)। সুতরাং, আমরা মুমিনেরা আমাদের বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত ভালো কাজের প্রতি আমাদের আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা প্রদত্ত চিন্তাশক্তি (সুরা কামার (৫৪) আয়াত ১৭: “আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি?”) দিয়ে আকৃষ্ট হব যাতে এই পৃথিবীতে ও আখিরাতে সাফল্য লাভ করতে পারি (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ২০১: “আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে-হে পরওয়ারদিগার! আমাদিগকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান কর এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদিগকে দোজখের আজাব থেকে রক্ষা করো”)।
১৮. বিনা কারণে ও তুচ্ছ ঘটনায় কোনো মানুষ হত্যা ইসলামের আলোকে জঘন্য কাজ (সুরা আল মায়েদাহ (০৫) আয়াত ৩২ : “এ কারণেই আমি বনী-ইসরাইলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে, সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। তাদের কাছে আমার পয়গম্বরগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলি নিয়ে এসেছেন। বস্তুত এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমাতিক্রম করে”)। শরীয়াহ আইন অনুযায়ী, কেউ কোন মানুষকে হত্যা করলে তাকে বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। শরীয়াহ আইন হত্যাকারীকে ক্ষমা প্রদর্শনেরও নির্দেশ দেয়, যদি হত্যা হওয়া ব্যক্তির নিকট আত্মীয়রা হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেয়। তবে আখিরাতে হত্যাকারীকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে (সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ৯৩ : “যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি রাগান্বিত হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন”)।সুতরাং, আমরা মুমিনেরা সামান্য কথা কাটাকাটির কাছেও যাব না, যদি সেটি বড়ো কোনো অঘটন বয়ে নিয়ে আসে।
১৯. রসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ অনুসরণ করা মুমিনের জন্য অবশ্যই পালনীয় কাজ। রসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ অনুসরণ করলে মুমিনের জন্য আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হকও পালন হয়ে যাবে (সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ৮০ : “যে লোক রসুলের হুকুম মান্য করবে, সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল। আর যে লোক বিমুখতা অবলম্বন করল, আমি আপনাকে (হে মুহাম্মদ), তাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি”; সুরা আল আনফাল (০৮) আয়াত ২০ : “হে ইমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রসুলের নির্দেশ মান্য কর এবং শোনার পর তা থেকে বিমুখ হয়ো না”; সুরা আন নূর (২৪) আয়াত ৫৪ : “বলুন, আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসুলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্যে সে দায়ী এবং তোমাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্যে তোমরা দায়ী। তোমরা যদি তাঁর আনুগত্য কর, তবে সৎ পথ পাবে। রসুলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টরূপে পৌঁছে দেয়া”)। রসুলুল্লাহ (সা.) কথা এবং কাজ মেনে চলাই হলো তার সুন্নত অনুসরণ। গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ গুলো হলো : নিয়মিত সুন্নত ও নফল নামাজ আদায়, প্রতিটি কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা, ডান দিক থেকে শুরু করা, ঘুমানোর আগে অজু করা ও নির্দিষ্ট দোয়া পড়া, ডান কাতে ঘুমানো, ঘুম থেকে উঠে দোয়া পাঠ করা, উভয় হাত ধুয়ে বসে খাওয়া, ডান হাতে খাওয়া, তিন শ্বাসে পান করা, খাওয়ার পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা, নিয়মিত মেসওয়াক করা, নখ কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, ডান হাত দিয়ে জামা পরা, ডান পা দিয়ে জুতো পরা শুরু করা, সর্বদা সত্য বলা, কোমল ভাষায় কথা বলা, কারো সাথে দেখা হলে সালাম দেওয়া ও মুচকি হাসা, পরিবারের সদস্যদের সাথে উত্তম আচরণ করা, প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, লেনদেনে সততা বজায় রাখা এবং ওয়াদা পূরণ করা।
২০. আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক পালনে আমাদের (মুমিন মুসলিমদের) অন্যতম চিন্তা এবং কাজ হওয়া উচিত শয়তানকে (সুরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ : “আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরপর আকার-অবয়ব, তৈরি করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলছি-আদমকে সেজদা কর তখন সবাই সেজদা করেছে, কিন্তু ইবলিস সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আল্লাহ বললেনঃ আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কীসে সেজদা করতে বারণ করল? সে বললঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা। বললেন তুই এখান থেকে যা। এখানে অহংকার করার কোন অধিকার তোর নাই। অতএব তুই বের হয়ে যা। তুই হীনতমদের অন্তর্ভুক্ত। সে বললঃ আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ বললেনঃ তোকে সময় দেয়া হল। সে বললঃ আপনি আমাকে যেমন উদ্ভ্রান্ত করেছেন, আমিও অবশ্য তাদের জন্যে আপনার সরল পথে বসে থাকবো। এরপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। আল্লাহ বললেনঃ বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে। তাদের যে কেউ তোর পথে চলবে, নিশ্চয় আমি তোদের সবার দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করে দিব”) পরিপূর্ণভাবে চেনা ও তাকে মোকাবিলা করা। শয়তান শুধু আমাদের শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রেই বিচরণ করে না, সে আমাদেরকে দিয়ে সবধরনের অন্যায় ও খারাপ কাজ করিয়ে জাহান্নামের দিকে প্ররোচিত করে। যদিও শয়তান অদৃশ্য কুপ্ররোচনাকারী, একমাত্র ভালো চিন্তা ও কাজ এবং আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক ও রসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ অনুশীলনের মাধ্যমেই শয়তান ও শয়তানরূপী মানুষের (যে ব্যক্তি নিজে অন্যায় ও পাপে কাজে লিপ্ত থাকে এবং অন্যকে অসৎ পথে ও অপরাধের দিকে প্রলুব্ধ করে) কুপ্ররোচনাকে পরাজিত করা সম্ভব (সুরা নাস (১১৪) আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬ : “বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি মানুষের পালনকর্তার, মানুষের অধিপতির, মানুষের মা’বুদের তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্মগোপন করে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে জ্বিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে”)।
২১. আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক পালনে পবিত্র কুরআন এবং হাদিসে বর্ণিত নিষিদ্ধ কাজ হতে আমাদেরকে বিরত থাকতে হবে। এই নিষিদ্ধ কাজগুলো হলো ১। শিরক করা অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসাবে গণ্য করা, ২। সুদ দেয়া, নেয়া এবং সুদের কাজ করা, ৩। নেশা করা যেমন মদ, গাজা, সিগারেট ইত্যাদি ক্ষতিকর দ্রব্য যা মানুষের শরীরের জন্য উপকারী নয়, ৪। অবৈধ বিয়ে বহিভূর্ত নারী-পুরুষ মেলামেশা করা এবং কোরআনে বর্ণিত ১৪ জন নিকট আত্মীয়ের সাথে বিয়ে সম্পকিত কোন সম্পর্কে জড়ানো যেমন: মা-বাবা, আপন চাচা-মামা, আপন ফুফু-খালা, আপন দাদা-দাদী, আপন নানা-নানী, আপন নাতী-নাতনী, আপন ভাই-বোন এবং দুই বোনকে একই সাথে বিয়ে করা, ৫। শুকরের মাংস, ৬। আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার নাম ব্যতীত জবেহ করা পশু, ৭। পশুর রক্ত, ৮। জুয়া খেলা, ৯। পরচর্চা এবং পরনিন্দা করা, ১০। মিথ্যা কথা বলা, ১১। অশ্লিলতা করা, ১২। কটু কথা বলা, ১৩। হত্যা করা, ১৪। জুলুম করা, ১৫। মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া, ১৬। চুরি, ডাকাতি এবং ছিনতাই করা, ১৭। ঘুষ বা অবৈধ লেনদেন করা, ১৮। ওজনে কম দেয়া, ১৯। বিনা কারণে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা, ২০। যৌতুক দেয়া এবং নেয়া, ২১। প্রতারনা করা, ২২। কথার বরখেলাপ করা, ২৩। অন্যের সম্পদ হানি এবং আত্মসাত করা, ২৪। অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়া, ২৫। হিজাব বা পর্দা না করা (নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্য), ২৬। আমানতের খেয়ানত করা, ২৭। নামাজ পরিত্যাগ করা, ২৮। যাদু-টোনা করা, ২৯। ভাগ্য বা তকদীর অস্বীকার করা, ৩০। উপকার করে খোটা দেয়া, ৩১। অহংকার করা, ৩২। রোজা না রাখা যৌক্তিক কোন শারীরিক কারন ছাড়া, ৩৩। আত্মহত্যা করা, ৩৪। সতী নারীকে অপবাদ দেয়া, ৩৫। যাকাত আদায় না করা, ৩৬। প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া, ৩৭। আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা, ৩৮। অদৃশ্যের খবর জানার দাবী করা, ৩৯। গনকের সাথে সম্পর্ক রাখা এবং বিশ্বাস করা, ৪০। প্রস্রাব থেকে পবিত্র না থাকা, ৪১। চুক্তি ভিত্তিক বিয়ে করা, ৪২। মিথ্যা কসম খাওয়া, ৪৩। অস্ত্র দ্বারা ভয় দেখানো বা ইঙ্গিত করা, ৪৪। লোক দেখানো সৎ কাজ করা, ৪৫। পুরুষের রেশমী পোষাক এবং স্বর্ণ-রৌপ্র পরিধান করা, ৪৬। সৌন্দর্য্যের উদ্দেশ্যে ভ্র তুলে ফেলা বা চিকন করা, ৪৭। পুরুষ এবং নারী একে অপরের বেশ ধরা, ৪৮। বিপরীতে লিঙ্গের প্রতি কামনা দৃষ্টিতে তাকানো, ৪৯। ভ্রান্ত মতবাদ বা খেয়াল খুশীমত বিদাতে লিপ্ত হওয়া, ৫০। বিনা প্রয়োজনে তালাক চাওয়া, ৫১। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অবাধ্য হওয়া, ৫২। বিশ্বাস ভঙ্গ করা, ৫৩। অঙ্গীকার পূরণ না করা, ৫৪। তাবিজ-কবজে বিশ্বাস করা, ৫৫। ভেজাল পণ্য বিক্রি করা, ৫৬। হিংসা করা এবং ৫৭। আল্লাহর রাস্তায় বাধা দেয়া।
২২. আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক পালনে আমাদেরকে (মুমিন মুসলিমদের) জিহাদ বা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা/ কঠোর পরিশ্রম/ সংগ্রাম করতে হবে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর দ্বিনকে সমুন্নত রাখতে। এটা মুমিন মুসলিমদের দায়িত্ব যে তারা তাদের নিজেদের জান, মাল ও মেধা দিয়ে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার পথে জিহাদ করবে : বিনিময়ে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা মুমিনদেরকে দুনিয়াতে সাহায্য এবং আখেরাতে সাফল্য দিবেন (সুরা আছ-ছফ (৬১) আয়াত ১০, ১১, ১২, ১৩ : “মুমিনগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনপণ করে জেহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম; যদি তোমরা বোঝ। তিনি তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন এবং এমন জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং বসবাসের জান্নাতে উত্তম বাসগৃহে। এটা মহাসাফল্য। এবং আরও একটি অনুগ্রহ দিবেন, যা তোমরা পছন্দ কর। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং আসন্ন বিজয়। মুমিনদেরকে এর সুসংবাদ দান করুন”)। সুতরাং, জিহাদের মাধ্যমে মুমিনেরা যা অর্জন করবে তা হলো : নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদের মাধ্যমে নিজের কুপ্রবৃত্তি, অসৎ চিন্তা ও শয়তানের কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেকে একজন সৎ ও চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলা, পবিত্র কুরআন ও হাদিসের সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং সেই মোতাবেক জীবন পরিচালনা করা, দাওয়াতের মাধ্যমে সমাজে ন্যায় ও কল্যাণের প্রচার এবং অসৎ কাজের প্রতিবাদ করার মাধ্যমে সত্যের পথে আহ্বান জানানো, সম্পদের জিহাদ হিসাবে ইসলাম প্রচার, মানবকল্যাণ এবং আল্লাহর পথে নিজের সম্পদ ব্যয় করা, সশস্ত্র সংগ্রামের জিহাদ হিসাবে ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলিম ভূখণ্ডে অন্যায় আগ্রাসন প্রতিহত করতে এবং আত্মরক্ষার জন্য শরিয়তের কঠোর নিয়ম মেনে যুদ্ধ করা যেটি জায়েজ, তবে সন্ত্রাসের নামে ইসলামে নিরীহ মানুষ হত্যা বা সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থান নেই। সর্বোপরি, জিহাদের মাধ্যমে মুমিনরা মানবতার কল্যাণ সাধন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নিজেকে আত্মশুদ্ধি করার মাধ্যমে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক ও নৈকট্য লাভ করতে পারে।
পরিশেষে, পবিত্র কুরআন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জ্ঞানগর্ভ কথা। পবিত্র কুরআনে ৬,৬৬৬ টি আয়াত রয়েছে। আমাদের মুমিনদেরকে এই সবগুলো আয়াতই পড়তে এবং উপলব্ধি করতে হবে যাতে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার অন্যতম হকগুলো পালন করতে পারি।