Satan’s Deception

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা স্পষ্টতই আমাদেরকে (মুমিন মুসলিমরা) জানিয়ে দিয়েছেন মানুষের প্রকৃত শত্রু কে। এই ভয়ংকর শত্রু কীভাবে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়? কীভাবে এই শত্রু আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার আদেশ অমান্য করে আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) কে সেজদা না করে সে আগুনের তৈরি বলে অহংকার করেছিল? বিনিময়ে এই ভয়ংকর শত্রু আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার আরশ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল এবং এই প্রতিজ্ঞা করেছিল, সে আমাদেরকে কুপথে পরিচালিত করে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা হক এবং মানুষের হককে বরবাদ করে দেবে। এই ভয়ংকর শত্রু হলো : জিন শয়তান, যাকে আমরা চোখে দেখি না, তবে অনুভব করি তার উপস্থিতি আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর : প্রতিনিয়ত অন্যায় কাজের প্ররোচনাকারী হিসেবে (সুরা ফাতির (৩৫) আয়াত ৬ : “শয়তান তোমাদের শত্রু, অতএব তাকে শত্রু রূপেই গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে আহ্বান করে যেন তারা জাহান্নামি হয়”; সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ১৬৮ : “হে মানব মন্ডলী, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু-সামগ্রী ভক্ষণ কর। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু"; সুরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ২০০ : “আর যদি শয়তানের প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর শরণাপন্ন হও; তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী”)। অন্যদিকে মানুষ শয়তান, যার মস্তিষ্ক জিন শয়তান দ্বারা আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে দখলীকৃত : প্রকাশ্যে মানুষকে কু-পরামর্শ দিয়ে পথভ্রষ্ট করা অব্যাহত রয়েছে। তারা মনোমুগ্ধকর কথা দিয়ে প্ররোচিত করে থাকে এবং অসচেতন মুমিনেরা ধোঁকায় পতিত হন। এজন্য, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালা বান্দাদেরকে মানুষ শয়তান ও জিন শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন। যে-সব বান্দারা তাদের বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আল্লাহ সুবাহনাতায়ালার হক ও মানুষের হককে গুরুত্ব দিয়ে জীবন অতিবাহিত করবে, তারাই জিন ও মানুষ শয়তানের প্ররোচনাকে পরাজিত করতে পারবে (সুরা নাহল (১৬) আয়াত ৯৮, ৯৯ : “অতএব, যখন আপনি কুরআন পাঠ করেন তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করুন। তার আধিপত্য চলে না তাদের উপর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আপন পালন কর্তার উপর ভরসা রাখে”)। জিন ও মানুষ শয়তানের অন্যতম কিছু কাজগুলো যা আমাদের সমাজকে কলুষিত করেছে এবং আমাদের (মুমিন মুসলিমদের) হৃদয়ে বেদনা আনয়ন করেছে তা বর্ণনা করা হলো :

১. শয়তান এতটাই ধোঁকাবাজ যে, সে মুমিনদেরকে সুকৌশলে শিরকের দিকে ধাবিত করে। যদিও শয়তান খুব ভালো করেই জানে যে, মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা শিরকের গুনাহ কখনোই ক্ষমা করবেন না (সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ১১৬, ১১৭, ১১৮, ১১৯, ১২০, ১২১ : “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ-ছাড়া অন্য অপরাধের জন্যে যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। কেউ আল্লাহর সাথে শরিক করলে সে মারাত্মকভাবে পথভ্রষ্ট হয়। আল্লাহর বদলে ওরা তখন মূর্তি ও শয়তানকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে। আল্লাহ যখন শয়তানকে লানত করেন, তখন সে বলে, ‘আমি তোমার বান্দাদের এক অংশকে অবশ্যই আমার অনুসারী বানাব। আমি তাদের বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করব। তাদের ভেতরে মোহ ও আসক্তি সৃষ্টি করব। আমার নির্দেশে তারা দেবদেবীকে উৎসর্গ করার জন্যে পশুর কর্ণচ্ছেদ করবে। আমার নির্দেশে তারা স্রষ্টার সৃষ্টির বিকৃতি ঘটাবে।’ (অতএব, শুনে রাখো) আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে যে তার প্রভু হিসেবে গ্রহণ করবে, সে সুস্পষ্ট ভয়ংকর ক্ষতির সম্মুখীন হবে। শয়তান ওদের আশ্বস্ত করে, হৃদয়ে অন্ধ মোহ ও আসক্তি সৃষ্টি করে। আসলে শয়তানের আশ্বাস তো ছলনামাত্র। নিঃসন্দেহে শয়তান-অনুসারীদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম। এ থেকে ওরা কোনো নিষ্কৃতি পাবে না”)। তাই, সে মুমিন বান্দাদের সরাসরি মূর্তি পূজা বা বড়ো শিরকের দিকে ডাকতে না পেরে, অত্যন্ত সুকৌশলে ও সূক্ষ্ম উপায়ে শিরকের দিকে ধাবিত করে। শয়তান মুমিনদেরকে যেভাবে শিরকের দিকে ধাবিত করে তার কয়েকটি প্রধান কৌশল হলো : প্রথমত, শয়তান মুমিনদেরকে কখনই নামাজ, সদকা বা রোজা ছাড়াতে পারে না। তখন সে মুমিনদের মনে কুপ্ররোচনা দেয় এই বলে যে, তারা যেন ইবাদতগুলো সুন্দর করে করে, যাতে মানুষ তাদের প্রশংসা করে। কোনো ইবাদত যদি মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সন্তুষ্টির পাশাপাশি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা 'রিয়া' বা ছোট শিরকে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত, ডাক্তার, ওষুধ বা কোনো ব্যক্তির উছিলায় বিপদ থেকে মুক্তি পেলে, শয়তান মানুষের মনে এমন বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয় যে—"অমুক ডাক্তার না থাকলে আমি মারাই যেতাম"। যদিও আরোগ্য বা সাহায্য যে একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে—এই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যায় এবং সৃষ্টির ওপর ভরসা চলে আসে, যা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয়ত, শয়তান ইতিহাসে সবসময়ই এই কৌশলটি ব্যবহার করেছে। কোনো পীর, বুজুর্গ বা নেককার মানুষের প্রতি ভক্তি বাড়াতে বাড়াতে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে মানুষ তাদের কাছে দোয়া চাইতে শুরু করে বা মনে করে তারা অলৌকিকভাবে সব মুশকিল আসান করতে পারেন। অতীতে কওমে নূহের যুগেও এভাবে ভালো মানুষদের ছবি ও মূর্তি বানিয়ে পরবর্তীতে পূজা শুরু হয়েছিল। এটি বড়ো শিরকের পথ উন্মুক্ত করে। চতুর্থত, দৈনন্দিন জীবনে জ্যোতিষী, রাশিফল, টিয়া পাখি দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা, কিংবা কোনো বিশেষ দিন বা বস্তুকে (যেমন : কালো বিড়াল, ভাঙা আয়না) অমঙ্গলের প্রতীক মনে করা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ভালো বা মন্দ করার ক্ষমতা রাখে—এই ধারণা মনে গেঁথে দিয়ে শয়তান মানুষকে শিরকে লিপ্ত করে। পঞ্চমত, সাধারণ কথায় বা আবেগপ্রবণ হয়ে বাবা-মা, সন্তান, নিজের জীবন বা কোনো সৃষ্টির নামে কসম খাওয়াকে শয়তান খুব স্বাভাবিক বানিয়ে দেয়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে কসম খেলো, সে শিরক করলো। শয়তানের এই ধোঁকা থেকে বাঁচতে হলে মুমিনদেরকে ইখলাস (নিষ্ঠা) রক্ষা করতে হবে (যে-কোনো ভালো কাজ করার আগে ও মাঝে নিজের নিয়তকে বারবার পরীক্ষা করা যে, কাজটি শুধু মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্যই হচ্ছে কিনা), বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দোয়া করতে হবে (বিশেষ করে রসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই দোয়াটি বেশি পড়া “হে আল্লাহ! আমি জেনে-শুনে আপনার সাথে শিরক করা থেকে আশ্রয় চাইছি এবং না জেনে হয়ে যাওয়া শিরকের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি”), এবং দ্বিনি জ্ঞান অর্জন করতে হবে (তওহিদ ও শিরক সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকলে শয়তানের এই সূক্ষ্ম ফাঁদগুলো সহজে ধরে ফেলা যায়)।

২. শয়তান সবসময় মুমিনদের মনে অত্যন্ত চতুর ও সূক্ষ্ম উপায়ে কুপ্ররোচনার (ওয়াসওয়াসা) মাধ্যমে তাদের ইমান দুর্বল করতে সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে (সুরা আল আরাফ (০৭) আয়াত ১৬, ১৭ : "এরপর ইবলিস বলল, ‘তুমি যাদের উপলক্ষ্য করে আমাকে চরম শাস্তি দিলে, তাদেরকে সাফল্যের সরলপথ থেকে বিচ্যুত করার জন্যে আমি ওত পেতে থাকব, এ আমার প্রতিজ্ঞা। সামনে, পেছনে, ডানে, বামে অর্থাৎ সম্ভাব্য সব দিক দিয়ে এবং সব উপায়ে আমি তাদের বিভ্রান্ত করব এবং তুমি তাদের অধিকাংশকেই অকৃতজ্ঞ হিসেবে পাবে”; সুরা আল হাশর (৫৯) আয়াত ১৬: "(এই মুনাফেকদের উপমা হচ্ছে শয়তান) শয়তান মানুষকে বলে, ‘সত্যকে প্রত্যাখ্যান করো।’ তারপর যখন সে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করল, তখন শয়তান বলে, ‘আমি তোমার কোনো দায়িত্ব নিইনি। আমি তো মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি!”; সুরা আনকাবুত (২৯) আয়াত ৩৮: "আমি আদ ও সামুদ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছিলাম। ওদের বিধ্বস্ত ঘরবাড়িই এর সুস্পষ্ট প্রমাণ। শয়তান ওদের কাজকে ওদের জন্যে চাকচিক্যময় ও মোহনীয় করে রেখেছিল। সত্যকে বোঝার শক্তি দেয়া সত্ত্বেও শয়তান ওদের সৎপথ থেকে সরিয়ে রেখেছিল”)। কোন কৌশলে এবং কীভাবে শয়তান মুমিনদের ইমান দুর্বল করার চেষ্টা করে তা হলো : ধীরে ধীরে পাপের দিকে নেওয়া (শয়তান সাধারণত একজন মুমিনকে সরাসরি বড়ো কোনো পাপ বা কুফরির নির্দেশ দেয় না। সে ছোট ছোট অন্যায় বা অলসতার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে এবং একসময় বড়ো পাপের দিকে ধাবিত করে), সন্দেহ ও সংশয় তৈরি করা (মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অস্তিত্ব, পরকাল কিংবা দ্বিনের বিভিন্ন বিধান নিয়ে মনে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম প্রশ্ন বা সংশয় তৈরি করার চেষ্টা করে), নেক আমলকে সুন্দর দেখিয়ে অহংকার আনা (অনেক সময় কোনো ভালো কাজ করার পর শয়তান মানুষের মনে 'রিয়া' বা লোক-দেখানো ভাব এবং অহংকার সৃষ্টি করে, যা আমলকে ধ্বংস করে দেয়), মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার রহমত থেকে নিরাশ করা (কোনো মানুষ ভুলবশত পাপ করে ফেললে শয়তান তাকে বোঝায় যে, "তুমি এত পাপী যে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার তোমাকে আর ক্ষমা করবেন না।" এর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে তওবা করা থেকে দূরে রাখা)। মুমিনদের মনে রাখতে হবে শয়তানের এই চতুর আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকে সর্বদা বিভিন্ন নেক আমলে সচেষ্ট থাকতে হবে : আউযুবিল্লাহি পড়া (মনে কোনো খারাপ চিন্তা বা প্ররোচনা আসলে সাথে সাথে ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম’ (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি), মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার স্মরণ করা (নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার জিকির, বিশেষ করে আয়াতুল কুরসি ও শেষ তিন সূরা (ইখলাস, ফালাক, নাস), দ্বিনি পরিবেশ ও সৎ সঙ্গে থাকা (ভালো ও ইমানদার মানুষের সাথে চলাফেরা করা, কারণ একাকী থাকলে শয়তানের আক্রমণ করার সুযোগ বেশি থাকে), ইলম বা দ্বিনি জ্ঞান অর্জন করা (দ্বিনের সঠিক জ্ঞান থাকলে শয়তানের সূক্ষ্ম ধোঁকাগুলো সহজে ধরে ফেলা যায়)।

৩. নীতি নৈতিকতাহীন, বিবেকহীন মস্তিষ্ককে জিন শয়তান তার চতুরতা ও লোভ-লালসার আহ্বানের মাধ্যমে মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে ভোগ-বিলাসের উৎযাপনকে, ‘মহাসাফল্য অর্জনের অহংকার’ হয়েছে বলে মন ও হৃদয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে সীমাহীন অপকর্ম করিয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, বেতনভোগী কর্মচারী ও কর্মকর্তা অন্যায়ভাবে নির্দিষ্ট মূল্যের সেবাতে অতিরিক্ত অর্থ (ঘুস) দাবি করে। জিন শয়তানের প্ররোচনায় এই ঘুষের অর্থ দিয়ে ঘুসখোর ব্যক্তি বাড়ি, গাড়ি কিনে বিলাসী জীবন উপভোগ করার মাধ্যমে মহাসাফল্য অর্জন করেছে বলে মনে কর। একইসাথে জিন শয়তান ব্যক্তিটিকে (মানুষ শয়তান) নামাজ, রোজা, ও হজ করারও প্ররোচনা দেয় যাতে সে মনে করে আখেরাতে সে নাজাত পাবে, যদিও তা নয়, কারণ ইসলামে ঘুস ও দুর্নীতিকে কবিরা গুনাহ (মহা পাপ) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এতেই মানুষ শয়তান থেমে থাকেনা, বরং তার সহকর্মীদেরও প্ররোচিত করে ঘুস ও দুর্নীতি করার জন্য এবং উৎসাহ দেয় নামাজ, রোজা, ও হজ তাদের দুর্নীতিকে ক্ষমা করবে, এখানেও জিন শয়তান, মানুষ শয়তানকে ধোঁকা দেয়। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে ঘুস ও দুর্নীতি (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ১৮৮ : “তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশে শাসন কর্তৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না" সুরা নাহল (১৬) আয়াত ৯৫ : “তোমরা আল্লাহর অঙ্গীকারের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে যা আছে, তা উত্তম তোমাদের জন্যে, যদি তোমরা জ্ঞানী হও”; সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ১৬১ : “আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায় ভাবে। বস্তুত, আমি কাফেরদের জন্য তৈরি করে রেখেছি বেদনাদায়ক আজাব”; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৯০১১ : “ঘুসদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহর লা‘নত”) হারামই নয় বরং অসহায় মানুষের উপর জুলুম যা চরম সামাজিক ব্যাধি হিসাবে বিবেচিত। তাই, আমাদেরকে (মুমিন মুসলিমদেরকে) জিন শয়তানকে পরাজিত করতে হলে ঘুস ও দুর্নীতিকে শুধু না বললেই হবে না, এর বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম করতে হবে, যাতে জিন শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ শয়তান সৃষ্টি না হয়।

৩. শয়তান সবসময় মুমিনদের মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ইবাদত, বিশেষ করে সালাত ও রোজা আদায় থেকে দূরে রাখার এবং বিভ্রান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে (সুরা আল মায়েদা (০৫) আয়াত ৯০, ৯১ : "হে বিশ্বাসীগণ! নিশ্চয়ই মাদকদ্রব্য, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্য নির্ণায়ক তীর বা পাশা নাপাক ঘৃণ্য বস্তু এবং শয়তানের হাতিয়ার। অতএব, তোমরা তা পুরোপুরি বর্জন করো, যাতে তোমরা সফল পরিতৃপ্ত হতে পারো। শয়তান তো মাদক (অর্থাৎ মদসহ সব নেশাকারক দ্রব্য) ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে চায়। এরপরও কি তোমরা এসব ঘৃণ্য বস্তু থেকে নির্বৃত্ত হবে না?”)। শয়তান যেভাবে শত্রুতা ও চক্রান্তের মাধ্যমে মুমিনদের সালাত এবং রোজা পালনে বাধা দেয় তা হলো : অলসতা ও টালবাহানার মাধ্যমে (সালাতের সময় হলে শয়তান মনে করিয়ে দেয়, ‘এখনও অনেক সময় আছে, পরে পড়লেও হবে’ এভাবে সময় পার করিয়ে দেয়), ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণার মাধ্যমে (সালাতে দাঁড়ালে দুনিয়ার যাবতীয় ভুলে যাওয়া কথা মনে করিয়ে দেয়, যাতে সালাতের মনোযোগ ও একাগ্রতা নষ্ট হয়), ভীতি ও সংশয় তৈরি করার মাধ্যমে (রোজার ক্ষেত্রে শয়তান মানুষকে ক্ষুধার ভয় দেখায়, অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সংশয় তৈরি করে ইবাদত থেকে বিরত রাখতে চায়)। তাই, মুমিনদেরকে যেভাবে শয়তানের আক্রমণ থেকে বাঁচতে হবে তা হলো : মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে আশ্রয় চাওয়া (যে-কোনো ইবাদত শুরু করার আগে বা শয়তানের কুউস্কানি অনুভব করলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে, ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি), দৃঢ় সংকল্প ও তাৎক্ষণিক আমল (আযান হওয়ার সাথে সাথে অলসতা না করে সালাতের প্রস্তুতি নেওয়া। কাজের ব্যস্ততা অজুহাত হিসেবে না দেখিয়ে ইবাদতকে অগ্রাধিকার দেওয়া), জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত (নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার জিকির, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করা। যে ঘরে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জিকির হয়, সেখানে শয়তান দুর্বল হয়ে পড়ে), এবং ইবাদতের ফজিলত স্মরণ করা (সালাত ও রোজার মাধ্যমে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার যে অফুরন্ত রহমত, গুনাহ মাফ ও জান্নাত লাভের ওয়াদা রয়েছে—তা বারবার স্মরণ করা। এটি ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়)। তাই, মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে, শয়তান যতই চেষ্টা করুক না কেন, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ওপর যদি খাঁটি ইমান ও ভরসা (তাওয়াক্কুল) থাকে, সেক্ষেত্রে মুমিনদের ওপর শয়তানের কোনো আধিপত্য চলে না।  

৪. বাবা-মা হলো সন্তানদের জন্য মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দেওয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত—যাদের যত্ন, ভালোবাসা, ও মমতায় সন্তানেরা বড়ো হয়ে উঠে। মানুষের সবচেয়ে বড়ো শত্রু শয়তান (সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) আয়াত : ৬৪ “(আল্লাহ বললেন) যাও, তোমার কণ্ঠ দ্বারা যাকে পারো মোহিত করে সত্য থেকে সরিয়ে নাও। সর্বশক্তি নিয়ে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো, ওদের ও ওদের সন্তানদের যত পাপাচারে নিমগ্ন করা যায় করো, যত ধরনের প্রতিশ্রুতি পারো দাও। কিন্তু (তারা বুঝতে পারবে না যে) শয়তানের প্রতিশ্রুতি তো স্রেফ ছলনা”)—পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদেরকে অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ হতে প্ররোচিত করে। কারণ, শয়তানের মূল লক্ষ্যই হলো : মানুষের মাঝে অহংকার, ক্ষোভ ও দূরত্ব তৈরি করা, যাতে তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলো নষ্ট করে ফেলে। তাই, মুমিনদেরকে সবসময় শয়তানের প্রধান ফাঁদগুলো বিবেচনা করে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। শয়তানের প্রথম ফাঁদ হলো বাবা-মায়ের উপকার ভুলিয়ে দেওয়া (শয়তান সন্তানকে তার শৈশবের কথা এবং পিতা-মাতার ত্যাগ (কষ্ট, লালন-পালন, রাত জাগা) ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে), দ্বিতীয় ফাঁদ হলো বাবা-মায়ের ভুলত্রুটি বড়ো করে দেখানো ( পিতা-মাতার ছোটোখাটো ভুল বা সীমাবদ্ধতাকে শয়তান সন্তানের সামনে বিশাল করে উপস্থাপন করে, যাতে সন্তানের মনে ক্ষোভ জন্মায়), এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ফাঁদ হলো অহংকার তৈরি করা (সন্তান যখন নিজের পায়ে দাঁড়ায় বা শিক্ষিত হয়, তখন শয়তান তার মনে এই অহংকার দেয় যে, সে যা কিছু অর্জন করেছে তা নিজের যোগ্যতায় করেছে, এখানে পিতা-মাতার কোনো অবদান নেই)। সন্তানদের এই অকৃতজ্ঞতার পরিণতি খুবই ভয়াবহ : সন্তানরা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সন্তুষ্টি হারাবে (রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি নির্ভর করে পিতা-মাতার সন্তুষ্টির ওপর এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি নির্ভর করে পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির ওপর), সন্তানরা দুনিয়া ও আখিরাতে শাস্তি পাবে (পিতা-মাতার অবাধ্যতা ও অকৃতজ্ঞতা এমন এক পাপ, যার শাস্তি মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা দুনিয়াতেই দিয়ে দেন), এবং সন্তানদের আমল বরবাদ হয়ে যাবে (পিতা-মাতার সাথে খারাপ আচরণ করলে সন্তানের অন্য কোনো ভালো আমল বা ইবাদত সহজে কবুল হয় না)। সুতরাং, সন্তানদের শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচার উপায় হলো : পিতা-মাতার প্রতি ধৈর্য ও নম্রতা দেখানো (পিতা-মাতার আচরণ কখনো কষ্টের কারণ হলেও শয়তানের প্ররোচনায় পা না দিয়ে ধৈর্য ধরা এবং তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলা (উফ শব্দটিও না বলা), পিতা-মাতার জন্য দোয়া করা (নিয়মিত পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা—(সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) আয়াত : ২৩, ২৪: "আল্লাহ আদেশ করেছেন যে, (এক) তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো উপাসনা করবে না। (দুই) বাবা-মার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তোমার জীবদ্দশায় তাদের একজন বা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবুও তাদের ব্যাপারে ‘উহ্-আহ’ কোরো না, তাদের ধমক দিও না বা অবজ্ঞা কোরো না, তাদের সাথে আদবের সাথে কথা বলো। শ্রদ্ধা ভরা দৃষ্টিতে মমতার ডানা মেলে ছায়ার মতো আগলে রাখো এবং সবসময় তাদের জন্যে দোয়া করো: 'হে আমার প্রতিপালক! আমার মা-বাবা শৈশবে যে মমতায় আমাকে লালন করেছেন, তুমিও তাদের ওপর সে-রূপ করুণা বর্ষণ করো’ হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন"), পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ (কথায় ও কাজে পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো এবং তাদের ছোটখাটো ইচ্ছাকে মূল্যায়ন করা)।

৫. শয়তান বান্দার অন্যতম হক উত্তরাধিকার সম্পদ গ্রাস করতে নিকট আত্মীয়দেরকে প্ররোচিত করে। এক্ষেত্রে, শয়তান লোভ, হিংসা এবং দুনিয়াপূজার মাধ্যমে ভাই-বোন, মা-বাবা বা এতিম নিকটাত্মীয়দের হক নষ্ট করতে সাহায্য করে। তাই, সমাজে অহরহ দেখা যায় বাবা-মা অথবা বাবা-মা ও ছেলেরা মিলে অথবা ভাইয়েরা মিলে মেয়েদেরকে অথবা বোনদেরকে উত্তরাধিকার সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে (সূরা আল ফজর (৮৯) আয়াত : ১৭, ১৮, ১৯, ২০: “না, একথা সত্য নয়। আসলে (এটা তোমাদের কর্মফল) তোমরা এতিমের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করো না, অভাবী অসহায়কে অন্নদানে পরস্পরকে উৎসাহিত করো না, অন্যের উত্তরাধিকারের সম্পদ নিজেরা আত্মসাৎ করো, আর ধনসম্পত্তির প্রতি তোমাদের আকর্ষণ আসক্তিতে পরিণত হয়েছে”)। ইসলামি শরিয়ত এবং নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তরাধিকার বা মিরাশ সম্পদ আত্মসাৎ করা একটি কবিরা গুনাহ (মহাপাপ)। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন এবং এই আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। শয়তান কীভাবে মুমিনদের মনে কুচিন্তা ঢুকিয়ে নিকটাত্মীয়দের সম্পদ গ্রাস করতে প্ররোচিত করে তা হলো : বোনদের বঞ্চিত করার মাধ্যমে (বোনদের তো বিয়ে হয়ে গেছে, তারা তো পরের বাড়ি চলে গেছে, তাই পৈতৃক সম্পত্তিতে কেবল ভাইদেরই অধিকার। এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল এবং জাহেলি ধারণা), এতিমের মাল আত্মসাৎ (কোনো ভাই বা বোন মারা গেলে তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের সম্পদ চাচা বা অন্য আত্মীয়রা দায়িত্ব নেওয়ার নামে গ্রাস করে ফেলে), অসুস্থতা বা দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া (পিতা-মাতা জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো এক সন্তান অন্য ভাই-বোনদের না জানিয়ে জালিয়াতি বা জোরপূর্বক নিজের নামে সম্পত্তি লিখে নেয়)। সুতরাং, শয়তানের প্ররোচনায় এই নিকৃষ্ট ও ভয়াবহ পাপ থেকে মুমিনদের বাঁচার ও প্রতিকারের উপায়গুলো হলো : অনতিবিলম্বে বণ্টন (কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী সম্পদ হিসেব করে যার যার অংশ বুঝিয়ে দেওয়া উচিত), তওবা ও সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া (কেউ যদি অতীতে ভুল করে বা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে আত্মীয়দের সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকেন, তবে প্রকৃত তওবার শর্ত হলো—পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং অনতিবিলম্বে সেই পাওনাদার আত্মীয়দের কাছে তাদের হক ফিরিয়ে দেওয়া বা তাদের থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া), লোভ বর্জন (মনে রাখা দরকার, দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী সম্পদ ভোগ করার জন্য নিজের পরকাল এবং চিরস্থায়ী জীবনকে ধ্বংস করা চরম বোকামি)।

৬. মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষ সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করার জন্য কে সৎ ও ন্যায়ের পথে অগ্রগামী। এজন্য, মহাজ্ঞানী ও রিজিকদাতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবাইকে রিজিক সমান দেননি। অবশ্য, দয়ালু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবাই যেন সমাজে খেয়ে-পরে ভালোভাবে বেচে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল লোকদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে সবল লোকদের (যাদের আয় ও সঞ্চয় নিসাব স্তরের উপরে) জাকাত দেয়ার আদেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন অনুযায়ী অর্থনৈতিকভাবে শোচনীয় এবং জাকাত গ্রহণ করতে পারবেন এই আট ধরনের লোকেরা হলেন : দরিদ্র, অভাবী, জাকাত সংগ্রাহক এবং বিতরণকারী, নতুন মুসলিম, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, ইসলাম প্রচার, এবং মুসাফির। জাকাত অর্থনৈতিকভাবে সবল মুমিনদের জন্য ফরজ কাজ। তবে শয়তান মুমিনদেরকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে চায়। শয়তান যেভাবে মুমিনদেরকে জাকাত আদায় না করতে প্ররোচনা ও কৌশল অবলম্বন করে তা হলো : দারিদ্র্যের ভয় দেখানো (শয়তান মানুষের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দেয় যে, জাকাত দিলে তার ধন-সম্পদ কমে যাবে এবং সে গরিব হয়ে পড়বে (সূরা আল বাকারা (২) আয়াত : ২৬৮: “শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় আর বখিল বা কৃপণ হতে উৎসাহ জোগায়। অপরদিকে আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ”), সম্পদের লোভ ও মোহ (মানুষ তার কষ্টার্জিত সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত মায়া অনুভব করে। শয়তান এই মোহকে পুঁজি করে সম্পদ আঁকড়ে ধরার এবং তা কেবল নিজের ভোগ-বিলাসে ব্যবহার করার কুপ্ররোচনা দেয়), এবং পরের বছর দেওয়ার বাহানা (এবার থাক, সামনের বছর একসঙ্গে বেশি করে দেব—এমন চিন্তার মাধ্যমে শয়তান ফরজ কাজকে পিছিয়ে দেয়, যা অনেক সময় আর দেওয়াই হয়ে ওঠে না)। সুতরাং, মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে জাকাত দিলে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুমিনদের উপর খুশী থাকেন কারণ জাকাত দিলে মুমিনদের সম্পদে বৃদ্ধি ও বরকত হয়, সম্পদ পবিত্র হয় ও সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমে যা সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখে।

৭. সদকা হলো মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মুমিনদের ইচ্ছাকৃতভাবে দেওয়া যে-কোনো দান (আর্থিক) বা সৎকর্ম (মুচকি হাসি দিয়ে কথা বলা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা, কাউকে ভালো পরামর্শ দেওয়া বা যে-কোনো সৎকর্মই সদকার অন্তর্ভুক্ত)। জাকাতের অর্থ নির্দিষ্ট আট ব্যক্তি বা খাতে ব্যয় করতে হয়। কিন্তু সদকা যে কাউকে (গরিব-দুঃখী, আত্মীয়-স্বজন বা যে-কোনো মানুষের কল্যাণে) দেওয়া যায়। তাই, সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সদকার ভূমিকা অপরিসীম। সব মুমিনদেরকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী সাদাকায় অংশগ্রহণ করা অবশ্যই করণীয় (সূরা বনি ইসরাঈল (১৭) আয়াত : ২৯, ৩০ : “ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৃপণ হয়ো না বা অন্যকে সাহায্য করতে অনিচ্ছুক হয়ো না। আবার ব্যয়ের ক্ষেত্রে মুক্তহস্ত হয়ে (তোমরা সামর্থ্যের) সীমা ছাড়িয়ে যেও না। যদি করো, তাহলে তুমি নিন্দিত বা নিঃস্ব হবে। মনে রেখো, তোমার প্রতিপালক যাকে ইচ্ছা পর্যাপ্ত জীবনোপকরণ দেন, যাকে ইচ্ছা সীমিত জীবনোপকরণ দেন। অবশ্যই তিনি বান্দাদের প্রয়োজন সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন এবং তাদের সবকিছুই দেখেন”)। কারণ, সদকা বান্দার গুনাহ মাফ করে, বিপদ দূর করে এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাচার অন্যতম হাতিয়ার। শয়তান, মুমিনদের অন্যতম শত্রু, সদকা কাজে মুমিনদেরকে চতুরতার সঙ্গে বাধা দেয় (সূরা আল বাকারা (২) আয়াত : ২৬৪ : "হে বিশ্বাসীগণ! দানের কথা প্রচার করে ও গ্রহীতাকে কষ্ট দিয়ে বা খোঁটা দিয়ে তোমাদের দানকে সেই ব্যক্তির ন্যায় নিষ্ফল কোরো না, যে আত্মপ্রচারের জন্যে দান করে এবং আল্লাহ ও আখেরাতে অবিশ্বাসী। এ দানের উপমা হচ্ছে : মাটির আস্তর জমা একটি মসৃণ পাথরের চাতাল। প্রবল বৃষ্টি হলো। চাতালের ওপর থেকে সব মাটি ধুয়ে চলে গেল। তাদের উপার্জন তাদের কোনো উপকারে এলো না। সত্য অস্বীকারকারীদের আল্লাহ সৎপথ দেখান না”; সূরা বনি ইসরাঈল (১৭) আয়াত : ২৬, ২৭: "আত্মীয়স্বজনকে তাদের প্রাপ্য অধিকার দেবে এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরের হকও আদায় করবে। তোমরা সম্পত্তির অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি চূড়ান্ত অকৃতজ্ঞ”)। মুমিনদেরকে সদকায় বাধা দিতে শয়তানের চালবাজি বা কৌশলগুলো হলো : দরিদ্রতা ও অভাবের ভয় দেখানো ( শয়তান মানুষের মনে এই কুমন্ত্রণা দেয় যে, তুমি যদি এই টাকা দান করে দাও, তবে নিজে দরিদ্র হয়ে যাবে বা ভবিষ্যতে অনটনে পড়তে হবে), সদকা করার ইচ্ছা বিলম্বিত করা (শয়তান মানুষকে তাৎক্ষণিক সদকা করতে বাধা না দিয়ে বলে, আজ নয়, আগামী মাসে বা পরিস্থিতি একটু ভালো হলে দান করবে। এভাবে সে কালক্ষেপণ করিয়ে নেক কাজ থেকে বঞ্চিত করে), রিয়ার (লোক-দেখানো) প্ররোচনা (যদি কেউ দান করতে উদ্যত হয়, তবে শয়তান তাকে প্ররোচিত করে যেন সে মানুষকে দেখানোর জন্য বা সুনাম অর্জনের উদ্দেশ্যে দান করে। এতে ওই সদকার সওয়াব নষ্ট হয়ে যায়), তুচ্ছজ্ঞান করানো (শয়তান মুমিনের মনে এই ধারণা দেয় যে, তোমার এই সামান্য পরিমাণ টাকা বা বস্তু দিয়ে কার আর এমন উপকারে আসবে? এর চেয়ে বড়ো কিছু করার সুযোগ এলে তখন দিও। ফলে মানুষ ছোট সদকা করা থেকেও বিরত থাকে), এবং ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা ও কৃপণতা (বার্ধক্য, অসুস্থতা বা বিপদ-আপদের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শয়তান কৃপণতা ও লোভ জাগিয়ে তোলে, যাতে মানুষ নিজের সঞ্চিত সম্পদ রিজিকদাতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার রাস্তায় খরচ করতে দ্বিধাবোধ করে)।

৮. কর্জে হাসানা হলো : ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী জামানতবিহীন ও সম্পূর্ণ সুদমুক্ত কল্যাণমূলক ঋণ। আরবিতে 'করজ' অর্থ ঋণ এবং 'হাসানা' অর্থ উত্তম বা ভালো, অর্থাৎ "উত্তম ঋণ"। পবিত্র কুরআনে রিজিকদাতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজেই মুমিনদের কাছে কর্জে হাসানা বা উত্তম ঋণ চেয়েছেন, যা মূলত তাঁর অভাবী বান্দাদের সাহায্য করার একটি ঐশ্বরিক মাধ্যম (সূরা আল বাকারা (০২) আয়াত : ২৪৫ : "তোমাদের মধ্যে কে আল্লাহকে ‘কর্জে হাসানা’ (অর্থাৎ উত্তম ঋণ) দেবে? আল্লাহ বহুগুণ প্রবৃদ্ধিসহ তা ফেরত দেবেন। আল্লাহই মানুষের রিজিক বা জীবনোপকরণ কমান এবং বাড়ান। তোমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে”)। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা স্বয়ং মহা ধনী (আল-গনি) এবং সব সৃষ্টির রিজিকদাতা হওয়া সত্ত্বেও মানুষের কল্যাণে এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা বৃদ্ধির জন্য এই অনন্য পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। কর্জে হাসানার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল অপরিসীম। প্রথমত, সুদভিত্তিক শোষণকারী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নির্মূল করে সুদমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, ধনী ও দরিদ্রের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং সমাজে সহমর্মিতা ও ভালোবাসার সম্পর্ক জোরদার করে। তৃতীয়ত, দুস্থ ও অসচ্ছল মানুষদের মূলধন দিয়ে ব্যাবসা বা জীবিকা নির্বাহের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হয়। সর্বোপরি, সমাজে সম্পদের প্রবাহ অলস বা কুক্ষিগত না থেকে সম্পদের সঠিক গতিশীলতা বজায় থাকে। অথচ শয়তান মুমিনদেরকে কর্জে হাসানার বদলে সুদে ঋণ দিতে প্ররোচনা দেয়। শয়তান মানুষকে কর্জে হাসানা না দিতে যেভাবে প্ররোচিত করে তা হলো : প্রথমত,শয়তান দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে মুমিনদের মনে কুসংস্কার বা ভয় ঢুকিয়ে দেয় যে, অন্যকে সুদমুক্ত ঋণ দিলে নিজের টাকা কমে যাবে এবং নিজে অভাবের মুখে পড়বে; দ্বিতীয়ত, শয়তান সম্পদ কমে যাওয়ার মিথ্যা আতঙ্ক তৈরি করে মুমিনদেরকে সম্পদ কেবল নিজের কাছে জমিয়ে রাখলেই বাড়ে বলে ধোঁকা দেয়। অথচ রসুল (সা.) বলেছেন, সদকা বা দান করলে সম্পদ কমে না। কর্জে হাসানা এক ধরনের সদকার সমতুল্য; সবশেষে, শয়তান মুমিনদের মনে ভবিষ্যতের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা জাগ্রত করে এই বলে যে, ভবিষ্যতে যদি আমার বড়ো কোনো বিপদ আসে, তখন কী হবে? এমন কাল্পনিক ভয়ের ফাঁদে ফেলে শয়তান মানুষকে বর্তমানের একটি নেক কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে (সূরা মুহাম্মদ (৪৭) আয়াত : ২৫, ২৬ : "সৎপথ সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানার পরও যারা তা পরিত্যাগ করে, শয়তান তাদের প্রবঞ্চিত করে। শয়তান মিথ্যা আশায় ওদের মনকে ভরিয়ে রাখে। (ওরা এতটাই অধঃপতিত হয় যে) আল্লাহর সত্যবাণীকে যারা অপছন্দ করে, ওদের কাছে গিয়ে বলে, ‘কোনো কোনো বিষয়ে আংশিকভাবে আমরা তোমাদের কথা মেনে চলব।’ ওদের গোপন অভিসন্ধি আল্লাহ ভালো করেই জানেন”)।

৯. নীতি নৈতিকতাহীন, বিবেকহীন মস্তিষ্ককে জিন শয়তান তার চতুরতা ও লোভ-লালসার আহ্বানের মাধ্যমে মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে ভোগ-বিলাসের উৎযাপনকে, ‘মহাসাফল্য অর্জনের অহংকার’ হয়েছে বলে মন ও হৃদয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে সীমাহীন অপকর্ম করিয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, বেতনভোগী কর্মচারী ও কর্মকর্তা অন্যায়ভাবে নির্দিষ্ট মূল্যের সেবাতে অতিরিক্ত অর্থ (ঘুস) দাবি করে। জিন শয়তানের প্ররোচনায় এই ঘুষের অর্থ দিয়ে ঘুসখোর ব্যক্তি বাড়ি, গাড়ি কিনে বিলাসী জীবন উপভোগ করার মাধ্যমে মহাসাফল্য অর্জন করেছে বলে মনে কর। একইসাথে জিন শয়তান ব্যক্তিটিকে (মানুষ শয়তান) নামাজ, রোজা, ও হজ করারও প্ররোচনা দেয় যাতে সে মনে করে আখেরাতে সে নাজাত পাবে, যদিও তা নয়, কারণ ইসলামে ঘুস ও দুর্নীতিকে কবিরা গুনাহ (মহা পাপ) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এতেই মানুষ শয়তান থেমে থাকেনা, বরং তার সহকর্মীদেরও প্ররোচিত করে ঘুস ও দুর্নীতি করার জন্য এবং উৎসাহ দেয় নামাজ, রোজা, ও হজ তাদের দুর্নীতিকে ক্ষমা করবে, এখানেও জিন শয়তান, মানুষ শয়তানকে ধোঁকা দেয়। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে ঘুস ও দুর্নীতি (সুরা আল বাকারা (০২) আয়াত ১৮৮ : “তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশে শাসন কর্তৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না" সুরা নাহল (১৬) আয়াত ৯৫ : “তোমরা আল্লাহর অঙ্গীকারের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে যা আছে, তা উত্তম তোমাদের জন্যে, যদি তোমরা জ্ঞানী হও”; সুরা আন নিসা (০৪) আয়াত ১৬১ : “আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায় ভাবে। বস্তুত, আমি কাফেরদের জন্য তৈরি করে রেখেছি বেদনাদায়ক আজাব”; মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৯০১১ : “ঘুসদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহর লা‘নত”) হারামই নয় বরং অসহায় মানুষের উপর জুলুম যা চরম সামাজিক ব্যাধি হিসাবে বিবেচিত। তাই, আমাদেরকে (মুমিন মুসলিমদেরকে) জিন শয়তানকে পরাজিত করতে হলে ঘুস ও দুর্নীতিকে শুধু না বললেই হবে না, এর বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম করতে হবে, যাতে জিন শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ শয়তান সৃষ্টি না হয়।

 

 

 

Find Articles, Fatwas, And Knowledge

Search by topic, keyword, or category and press enter.